শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১২

দুটি জনমত জরিপ ও পৌরসভা নির্বাচন এবং ভুল বনাম বাস্তবতা



shafik-rehman11দেশের দু’টি দৈনিক পত্রিকা, প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার, দু’টি ভিন্ন জনমত জরিপ একই দিন, ৬ জানুয়ারি ২০১১-তে প্রকাশ করে। দু’টি পত্রিকাই তাদের প্রথম পৃষ্ঠায় বড়ভাবে এই জনমত জরিপ দু’টির সারাংশ প্রকাশ করে। দু’টি জরিপের বিস্তারিত রিপোর্ট গ্রাফিক্সসহ তারা প্রকাশ করে দু’টি ট্যাবলয়েড সাইজ ক্রোড়পত্রে। সারা দেশের পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচনের মাত্র পাঁচদিন আগে প্রকাশিত এই দু’টি জরিপ সঙ্গত কারণে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, কর্মী, সমর্থক এবং ভোটার মহলে কৌতূহল সৃষ্টি করে। প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারের ওই দু’টি জরিপের মূল কথা কী ছিল এবং ১১ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি ২০১১ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনের মূল ফলাফলের মধ্যে কী বিশাল পার্থক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সে বিষয়ে এখন ভোটার মহলে কৌতূহল উদ্দীপক আলোচনা চলছে। ভোটার মহল মনে করছে, বাস্তব ফলাফল হয়েছে খুবই ভিন্ন, সেহেতু এই দুটি জরিপের প্রকৃত লক্ষ্য কী ছিল সেটা গভীরভাবে বিবেচনা করা উচিত।
সাপ্তাহিক যায়যায়দিনে জনমত জরিপের সূচনা
এই বিষয়ে আলোচনার আগে আমি বিনয়ের সঙ্গে জানাতে চাই বাংলাদেশে রাজনৈতিক জনমত জরিপ সম্ভবত প্রথম সূচনা করেছিল সাপ্তাহিক যায়যায়দিন ১৮ মার্চ ১৯৮৬-তে। তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ ঘোষিত ৭ মে ১৯৮৬-র সাধারণ নির্বাচন বিষয়ে তখন খুব সহজ প্রশ্ন ভোটারদের করা হয়েছিল। মোট ১৫টি প্রশ্ন সংবলিত প্রশ্নমালা দু’টি ভিন্ন রংয়ের কাগজে সারা দেশব্যাপী ৭০০ রিডার্স রাইটস কমিটির (যায়যায়দিনের পাঠক সংঘ) ৭০,০০০ সদস্যকে পাঠানো হয়েছিল। তখন যায়যায়দিনের বিক্রিত কপির সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় লক্ষ। শাদা প্রশ্নমালায় কমিটির সদস্যরা (অর্থাৎ যায়যায়দিনের পাঠকরা) উত্তর দেন এবং রঙিন প্রশ্নমালায় যারা যায়যায়দিনের পাঠক নন তাদের কাছ থেকে কমিটির সদস্যরা উত্তর সংগ্রহ করেন।
দু’টি ভিন্ন উত্তরের অর্থাৎ, পাঠকদের এবং যারা পাঠক নন তাদের ফলাফল ১৮ মার্চ ১৯৮৬-তে যায়যায়দিনে প্রকাশিত হয়েছিল। এই দু’টি ফলাফল বিষয়ে সম্পাদকীয় মন্তব্য ছিল, ‘আমরা জানি কোনো জনমত জরিপই সম্পূর্ণভাবে সঠিক হতে পারে না। সুতরাং এই জরিপের ফলাফল যে জনমতের সম্পূর্ণ সঠিক প্রকাশ তেমন দাবি আমরা করবো না। তবে যেহেতু এই জরিপটি রিডার্স রাইটস কমিটির সহযোগিতায় পরিচালিত হয়েছে সেহেতু এটি হয়েছে দেশব্যাপী এবং এতে অংশগ্রহণ করেছেন বিভিন্ন বয়স ও পেশার ব্যক্তিরা। অবশ্য এই জরিপের একটি প্রধান সীমাবদ্ধতা হচ্ছে যে এতে কৃষক ও দিনমজুর কমই অংশ নিয়েছেন। আমরা আশা করছি ভবিষ্যতের জনমত জরিপে এই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।’

কিন্তু এর চার মাস পরেই যায়যায়দিন নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ায় এবং আমাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়ার ফলে আশির দশকে আর কোনো জনমত জরিপ করা সম্ভব হয়নি। ১৯৮৬-তে বাংলাদেশে কম্পিউটার প্রযুক্তি ছিল খুবই সীমাবদ্ধ। দেশের শীর্ষস্থানীয় চার্টার্ড একাউন্টেন্টস ফার্ম, রহমান রহমান হক-এ একটিও কম্পিউটার ছিল না। আমি তখন ওই ফার্মের সিনিয়র পার্টনার ছিলাম এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন আর্টিকলড ক্লার্কদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাদের মধ্যে প্রায় পঞ্চাশজন আমার বাড়ির বিভিন্ন রুমে গ্রুপে গ্রুপে দুই দিন দুই রাত ধরে দূর দূরান্ত থেকে পাঠানো হাজার হাজার খাম খুলে উত্তরমালাগুলো দুই রংয়ে ভাগ করে ট্যাবুলেশনে অংশ নেন। আজ এই মুহূর্তে আমার সেই সব প্রিয় আর্টিকলড ক্লার্ক, যাদের প্রায় সবাই এখন জীবনে প্রতিষ্ঠিত, তাদের জানাচ্ছি আন্তরিক শুভেচ্ছা। এই জরিপে সহযোগিতা করেছিলেন বাংলাদেশ ডাক বিভাগের কর্মচারীরা। প্রতিটি রিটার্ন খামের ওপর আমরা রাবার স্ট্যাম্পে লিখেছিলাম ‘জনমত জরিপ, দ্রুত প্রাপককে পৌছে দিন।’ ডাক বিভাগের কর্মচারিরা আমাদের এই ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। তারা অতি দ্রুত উত্তরমালাগুলো আমাদের অফিসে পৌছে দিয়েছিলেন। তখন কুরিয়ার সার্ভিস ছিল না। তাই জরিপের জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল স্যাম্পলের জন্য প্রয়োজন ছিল হাজার হাজার উত্তরমালার। আজ এই মুহূর্তে আগাম পোস্টাল সার্ভিসের সেইসব গণতন্ত্রপ্রেমিক কর্মচারীদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
এই বিষয়টির উল্লেখ করলাম এই জন্য যে ধর্ম, ভাষা, খাবার অভ্যাস, পোশাক প্রভৃতি বিষয়ে বাংলাদেশ খুবই হোমোজেনিয়াস (Homogeneous) দেশ হলেও অর্থনৈতিক কারণে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের জীবনযাত্রার ধরন হোমোজেনাস নয়। তাই এই দেশের সঠিক জনমত জরিপের জন্য প্রয়োজন বড় স্যাম্পল এবং সেটা তখন সম্ভব হয়েছিল অনেক ট্যাবুলেটর, বহু উত্তর সংগ্রাহক এবং ডাক বিভাগীয় কর্মচারীদের শ্রম ও দক্ষতার ফলে। এর গুরুত্বটা যে কি সেটা পাঠকরা একটু পরেই বুঝবেন। মার্চ ৮৬-র সেই জরিপের ফলাফল কতটুকু সঠিক ছিল সেটা জানা যায়নি। কারণ খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সেই নির্বাচন বয়কট করেছিল।
তবে, ইনটারেস্টিং বিষয় এই যে, ওই জরিপের ১৫ নাম্বার বা শেষ প্রশ্নটি ছিল :
আপনার মতে বর্তমান সরকার (এরশাদ সরকার) কীভাবে ক্ষমতাচ্যুত হবে?

এর সম্ভাব্য তিনটি উত্তর ছিল নির্বাচন, বিপ্লব (গণ অভ্যুত্থান) ও অন্যান্য।
উত্তর ছিল :
পাঠক অ-পাঠক
নির্বাচন ১৫% ২০%
বিপ্লব (অভ্যুত্থান) ৫৯% ৬২%
অন্যান্য ২৬% ১৮%

সেই মার্চ ৮৬-র জরিপের ফলাফল শেষ পর্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল প্রায় পৌনে পাঁচ বছর পরে ডিসেম্বর ১৯৯০-এ যখন একটি গণঅভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হন।
প্রসঙ্গত আরো উল্লেখ করা যেতে পারে ৮ অক্টোবর ১৯৮৪-তে সাপ্তাহিক যায়যায়দিন তার যাত্রা শুরু করার পর সেই বছরেই পাঠকদের প্রতি আহ্বান জানায়, টেলিভিশনের শ্রেষ্ঠ কলাকুশলীদের নির্বাচিত করতে। তাদের এই ভোটাভুটির ফলাফল ঘোষিত হয় মার্চ ১৯৮৫-তে শেরাটন হোটেলে অনুষ্ঠিত একটি ফাংশনে যেখানে উপস্থিত ছিলেন তদানীন্তন অন্যতম বিরোধী নেত্রী শেখ হাসিনা। বস্তুত ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ পর্যন্ত যায়যায়দিনের পাঠক ও কর্মীরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন নিয়মিত জরিপ কাজে। আর সেজন্যই কম্পিউটার অনুপস্থিতি ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মার্চ ৮৬-র বিশাল জনমত জরিপটি করা সম্ভব হয়েছিল।
স্পেকট্রাম রেডিও-তে প্রতি সপ্তাহে জনমত জরিপ
আগস্ট ১৯৮৬-তে আমাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়া হয় লন্ডনে। সেই সময়ে বৃটেনে রাষ্ট্রীয় রেডিও-টিভি প্রতিষ্ঠান বিবিসি এবং বেসরকারি কয়েকটি টিভি প্রতিষ্ঠান চালু থাকলেও সেখানে বেসরকারি রেডিও প্রতিষ্ঠান ছিল না। ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭ থেকে আমি এবং আরো কিছু উৎসাহী ব্যক্তি বৃটেনে প্রাইভেট রেডিও স্টেশন চালু করার লক্ষ্যে কাজ করতে থাকি মার্গারেট থ্যাচার ছিলেন তখন বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী এবং আমার এলাকা, উত্তর লন্ডনে ফিঞ্চলি-র এমপি। আমাদের লক্ষ্য অর্জিত হয় ২৫ জুন ১৯৯০-এ। সেই দিন থেকে বৃটেনের প্রথম (এবং এখনো একমাত্র) বহুভাষাভিত্তিক বেতার কেন্দ্র স্পেকট্রাম রেডিও তার যাত্রা শুরু করে উত্তর লন্ডনে ব্রেন্ট ক্রস-এ। এই রেডিও স্টেশনের প্রতিষ্ঠাতা, ফাইনান্স ডিরেক্টর চিফ একজিকিউটিভ অফিসার (সিইও) হিসেবে কাজ করতে গিয়ে আমি আবার জড়িত হই জনমত জরিপের কাজে। তবে এবার জরিপের কাজটি করেন বৃটেনের দি জয়েন্ট ইনডাস্টৃ কমিটি ফর রেডিও অডিয়েন্স রিসার্চ (সংক্ষেপে জিকরার, JICRAR)। স্পেকট্রাম রেডিওতে তখন বাংলা, হিন্দি, উর্দু, চায়নিজ, ইটালিয়ান, পর্টুগিজ সহ ১৫টির বেশি ভাষায় অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো। আমরা জানতে চাইতাম কোন ভাষার অনুষ্ঠান এবং কোন অনুষ্ঠান শ্রোতারা বেশি শুনছে। প্রতি সপ্তাহে এই জরিপ কাজ করতো জিকরার। তাদের রিপোর্টের ওপর নির্ভর করতো রেডিও স্টেশনের বিজ্ঞাপন প্রাপ্তি ও তার হার। এই সময়ে জনমত জরিপের আধুনিকতম পদ্ধতি ও তার ইতিহাসের সঙ্গে আমি পরিচিত হই।
জনমত জরিপের সূতিকাগার আমেরিকা
বিভিন্ন সূত্রের মতে জনমত জরিপের সূচনা হয় ১৯২৪-এ আমেরিকাতে। সেই সময়ে দি হামসবার্গ পেনসেলভিনিয়ান পত্রিকা একটি স্থানীয় জরিপের পর জানায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদ নির্বাচনে দুই জন প্রার্থীর মধ্যে অ্যানড্রু জ্যাকসন এগিয়ে আছেন জন কুইন্সি অ্যাডামসের চাইতে। জরিপে জ্যাকসনের পক্ষে পড়েছে ৩৩৫ ভোট। আর অ্যাডামসের পক্ষে পড়েছে ১৬৯। এই ধরনের ছোট স্যাম্পল ও স্থানীয় জনমত জরিপ, যাকে বলা হয় স্ট্র পোল (Straw Poll) সাধারণত শহরেই করা হতো। ১৯১৬-তে লিটারারি ডাইজেস্ট পত্রিকা তাদের সার্কুলেশন বাড়ানোর লক্ষ্যে দেশব্যাপী জরিপ করে এবং সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করে যে উডরো উইলসন প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হবেন। এই জরিপ কাজের জন্য লিটারারি ডাইজেস্ট কয়েক লক্ষ পোস্টকার্ড দেশ জুড়ে পোস্ট করেছিল এবং যেসব পোস্ট কার্ডে উত্তর এসেছিল সেসব হাতে গোনার ভিত্তিতে ফলাফল ঘোষণা করেছিল। লক্ষ্য করুন, ৭০ বছর পরে যায়যায়দিন-ও প্রায় একইভাবে জরিপ কাজ সম্পন্ন করেছিল। এরপর চারটি প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে লিটারারি ডাইজেস্ট জনমত জরিপের মাধ্যমে সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল।
১৯৩৬-এ লিটারারি ডাইজেস্ট ফেসে যায়। তাদের জরিপে ২৩ লক্ষ ‘ভোটার’ অংশ নেয় এবং এটা ছিল বিশাল স্যাম্পল। কিন্তু এই ভোটাররা প্রায় সবাই ছিল সচ্ছল শ্রেণীর এবং রিপাবলিকান পার্টির সমর্থক। ইলেকশনের এক সপ্তাহ আগে লিটারারি ডাইজেস্ট রিপোর্ট করে ডেমক্রেট প্রার্থী ফ্র্যাংকলিন রুজভেল্ট-এর চাইতে রিপাবলিকান প্রার্থী আলফ লন্ডন বেশি জনপ্রিয়। একই সময়ে জর্জ গ্যালাপ অনেক ছোট স্যাম্পল কিন্তু বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে একটি জরিপ কাজ করেন। গ্যালাপের এই জরিপে অংশগ্রহণকারীরা দেশের জনগোষ্ঠির প্রতিনিধিত্বমূলক ছিল। রুজভেল্ট যে বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন সেটা গ্যালাপ আগেই সঠিক বলেছিলেন। এরপর লিটারারি ডাইজেস্ট-এর জরিপ কাজ শেষ হয়ে যায়। পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। লক্ষ্য করুন ৭৫ বছর পরে লিটারারি ডাইজেস্ট-এর মতোই ৬ জানুয়ারি ২০১১-তে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার একই ভুল করেছে। তবে আলো-স্টার বন্ধ হয়ে যাবে না। তাদের খুটি আপাতত অনেক শক্ত।
বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে জনমত জরিপে এগিয়ে আসেন আরো একজন আমেরিকান, এলমো রোপার। প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাংকলিন রুজভেল্ট ১৯৩৬, ১৯৪০ ও ১৯৪৪-এ যে আবারও নির্বাচিত হবেন, সেটা পরপর তিনবারই এলমো রোপার সঠিক ফোরকাস্ট করেছিলেন। ১৯৪৭ থেকে লুইস হ্যারিস নামে আরেক আমেরিকান বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে জরিপ শুরু করেন। পরে তিনি এলমো রোপারের ফার্মে যোগ দেন।
ইতিমধ্যে জর্জ গ্যালাপ তার সাবসিডিয়ারি অফিস খোলেন বৃটেনে। ১৯৪৫-এ গ্যালাপ সঠিক ফোরকাস্ট করেন যে লেবার পার্টি বিজয়ী হবে। সেই সময়ে অন্য সবাই ফোরকাস্ট করেছিলেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের হিরো, উইনস্টন চার্চিলের নেতৃত্বে টোরি পার্টি নির্বাচনে জিতবে। ফলে গ্যালাপের বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। বৃটেনে জনমত জরিপ একটা নিয়মিত বিষয় হয়।
কিন্তু আমেরিকা ও বৃটেনে কয়েকটি সময়ে জনমত জরিপ ভুল ফোরকাস্ট করেছিল। যেমন, আমেরিকায় ১৯৪৮-এ ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, ডেমক্রেট হ্যারি ট্রুম্যান হারবেন ও রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী টমাস ডুইয়ি বিশাল ভোটের ব্যবধানে জিতবেন। এই ফোরকাস্ট করেছিলেন গ্যালাপ এবং রোপার-ও। কিন্তু জিতেছিলেন হ্যারি ট্রুম্যান।
ঠিক তেমনি বৃটেনে ১৯৭০-এ টোরি পার্টি এবং ১৯৭৪-এ লেবার পার্টি যে জিতবে সেটা জনমত জরিপকারীরা বলতে পারেনি। ১৯৯২-এ প্রায় সব ওপিনিয়ন পোল বলেছিল নিল কিনোক-এর নেতৃত্বে লেবার পার্টি বিজয়ী হবে। কিন্তু সেই নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল জন মেজরের নেতৃত্বে টোরি পার্টি। এই কয়েকটি ভুল বাদ দিলে সাম্প্রতিক কালে আমেরিকা ও বৃটেনে জনমত জরিপ সঠিক ফোরকাস্ট করেছে।

গ্যালাপের সাজেশন
এরশাদের পতনের পর ১৯৯২-এ আমি স্বদেশে ফিরে এসে সাপ্তাহিক যায়যায়দিন পুনঃপ্রকাশ করি এবং আবার পাঠকের মাধ্যমে জনমত জরিপ শুরু করি রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক বিষয়ে। এক পর্যায়ে জরিপ কাজকে পত্রিকার বায়াস বা প্রভাবমুক্ত করার লক্ষ্যে সোশাল সার্ভে নামে একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান চালু করি। সোশাল সার্ভে পরিচালিত জরিপ কাজ যেন বিজ্ঞানসম্মত হয় সেই লক্ষ্যে আমি গ্যালাপ ইন্টারন্যাশনাল-এর তৎকালীন প্রধান কর্মকর্তা মিজ জেমস মেরিল-এর সঙ্গে ইস্ট এন্ড, লন্ডনে দেখা করি।
মিজ মেরিল আমাকে খোলাখুলিভাবে বলেন, গ্যালাপ ইন্টারন্যাশনালের ৯০% আয় হয় অরাজনৈতিক জরিপ কাজ থেকে। যেমন, কোকা কোলা মানুষ বেশি খায়, নাকি পেপসি কোলা? যদি কোকা কোলা বেশি খায় তাহলে তার কারণগুলো কী? স্বাদ? দাম? ক্যানের ডিজাইন ও রং? প্রাপ্তির সুবিধা? অথবা, কেএফসি বেশি জনপ্রিয় নাকি, পিৎজা হাট? কেন? ভোক্তারা কি বেশি মাংসাশী নাকি নিরামিষভোজী? ইত্যাদি। শুধু প্রডাক্টই নয়। মিজ মেরিল জানান, লন্ডনে হিথরো এয়ারপোর্ট সম্প্রসারণে হিথরো ও পার্শ্ববর্তী এলাকার জনমত কী সে বিষয়েও জরিপ কাজ হয়েছে। ওই সময়ে শব্দ দূষণের জন্য হিথরোর পাশের এলাকার মানুষ হিথরো এয়ারপোর্ট সম্প্রসারণের বিরোধিতা করছিল এবং বৃটিশ সরকার জানতে চাইছিল তাদের মতামত। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার আড়িয়াল বিলে বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট নির্মাণ কাজে হাত দেয়ার আগে এ রকম একটা জনমত জরিপ করবে কি? সে যাই হোক। মিজ মেরিল বলেন, ওপিনিয়ন পোল প্রতিষ্ঠানগুলোর সাধারণত এই ধরণের গভর্নমেন্ট কন্ট্রাক্ট অথবা মাল্টি ন্যাশনাল কম্পানিগুলোর প্রডাক্ট ও মার্কেটিং বিষয়ে জরিপের কাজ থেকে লব্ধ আয়ই প্রধান। রাজনৈতিক জরিপ কাজ থেকে আয় হয় কম এবং তা-ও সেই আয়ের বেশির ভাগ হয় প্রাক-নির্বাচন সময়ে। মিজ জেমস বলেন, বাংলাদেশে যেহেতু মালটিন্যাশনাল কম্পানি ও সরকারের পক্ষে জরিপ কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা কম, সেহেতু জরিপকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িকভাবে সফল হওয়ার সম্ভাবনাও কম। তাই গ্যালাপ ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। সাপ্তাহিক যায়যায়দিন জরিপ কাজ বন্ধ করে দেয়।
নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলাদেশের কিছু দৈনিক পত্রিকা জরিপ কাজ শুরু করে। তবে এসবই মূলত পাঠকদের মতামত জরিপ। ফলে এসব জরিপ শুধু পত্রিকার প্রভাবাধীন পাঠকদেরই মতামত জরিপ হয়, প্রভাবমুক্ত দেশবাসীর মতামত জরিপ হয় না। তাই এসব জরিপ সমাজের আংশিক মতামত প্রকাশ করতে পারে এবং এগুলো নির্ভরযোগ্য হয় না।

বড় স্যাম্পল
তবে বাংলাদেশে ১৯৯৫ থেকে জনমত জরিপ কাজ চালিয়ে যেতে থাকে ডেমক্রেসিওয়াচ নামে একটি এনজিও। তাই প্রতিষ্ঠানটি কিছু স্ট্যাটিসটিশিয়ানকে নিয়োগ দিয়ে একটি রিসার্চ টিম গঠন করে। তাদের ট্রেইনিং দেয়া হয়। এই টিম গ্যালাপ নীতিমালা অনুসরণ করে কয়েকটি জরিপ কাজ করে। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল জুন ২০০১-এ ঢাকা শহরে (পিপিআরসি-র সহযোগিতায়) এবং সেপ্টেম্বর ২০০১-এ দেশব্যাপী জনমত জরিপ।
অক্টোবর-এর সাধারণ নির্বাচনের আগে সেপ্টেম্বর ২০০১-এর জনমত জরিপে ডেমক্রেসিওয়াচের স্যাম্পল ছিল ৫,০০০। মুখোমুখি প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে এই জরিপ সম্পন্ন হয়েছিল। ডেমক্রেসিওয়াচের এই জনমত জরিপে রিপোর্ট করা হয়েছিল আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি জোট ৪২% ভোট পাবে। অক্টোবরের নির্বাচনে বিএনপি মোট ৪৭% ভোট পেয়ে বিজয়ী হয় এবং ডেমক্রেসিওয়াচের ফোরকাস্ট সঠিক প্রমাণিত হয়।
ওই নির্বাচনের আগে শোনা গিয়েছিল একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ কয়েকটি জরিপ করিয়েছে এবং প্রতিটি জরিপেই আওয়ামী লীগের জয় ফোরকাস্ট করা হয়েছিল।
ডেমক্রেসিওয়াচের ফোরকাস্ট সঠিক হওয়ার কারণ ছিল : বড় স্যাম্পল (৫,০০০ ভোটার), জনগোষ্ঠির সঠিক প্রতিফলন, সহজ প্রশ্নমালা এবং প্রশিক্ষিত জরিপকারী। এখানে উল্লেখ করা উচিত, তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, বিভিন্ন দূতাবাস, ডোনার এজেন্সি ও কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে ডেমক্রেসিওয়াচ তাদের জরিপের রিপোর্ট দিলেও, বিভিন্ন কারণে এটি তারা প্রকাশ করেনি। এরপর নির্বাচনী অভিযানের সময়ে টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নির্বাচন সম্পর্কিত প্রচারিত খবর এবং আলোচনার ওপর ডেমক্রেসিওয়াচ একটি জরিপ করে।

২০০০ সাল থেকে কম্পিউটার ব্যবহার প্রসারিত হবার ফলে বাংলাদেশে ক্রমেই বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় অনলাইন জরিপ প্রকাশিত হতে থাকে। তবে আগেই বলেছি এ সব জরিপ, পত্রিকার নিজস্ব পাঠককুলের জরিপ। এ ছাড়াও শোনা যায় ডিজিএফআই, এনএসআই, কিছু দূতাবাস ও কিছু রাজনৈতিক দল ও সংস্থা, বিভিন্ন সময়ে জনমত জরিপ করছে যার ফলাফল শুধু সরকারকে জানানো হয়।
নির্বাচনের ওপর জরিপের প্রভাব
৬ জানুয়ারি ২০১১-তে প্রকাশিত জনমত জরিপ দু’টি করেছে (১) প্রথম আলোর উদ্যোগে ওআরজি-কোয়েস্ট রিসার্চ লিমিটেড এবং (২) ডেইলি স্টারের উদ্যোগে এসি নিলসেন। এই দু’টি জরিপ সম্পর্কে বলার আগে প্রাসঙ্গিক কিছু তথ্য পাঠকদের দিতে চাই।
লন্ডনের ডেইলি মেইল পত্রিকার কলামিস্ট পিটার হিচেন্স তার বই দি ব্রোকেন কমপাস (The Broken Compass বা ভাঙ্গা কমপাস)-এ লিখেছেন, মানুষ তাদের ভোট কাকে দেবে সেই মনোভাব জনমত জরিপের মাধ্যমে প্রকাশ করার ফলে জনমতই প্রভাবিত হয়। এটা হতে পারে তিনভাবে।

এক. জনমত জরিপ প্রকাশের ফলে একটা ব্যান্ডওয়াগন এফেক্ট (Bandwagon Effect) হয়। জনমত জরিপে যে প্রার্থী এগিয়ে থাকেন, তারই ব্যান্ডে বা দলে যোগ দিতে থাকেন অন্যান্য ভোটাররা। সম্ভাব্য বিজয়ীর সঙ্গে থাকলে ভবিষ্যতে লাভবান হওয়া যাবে এই মনোভাব তখন ভোটারদের মধ্যে কাজ করতে থাকে।
দুই. জনমত জরিপ প্রকাশের ফলে বিপরীতমুখী মনোভাব কাজ করতে পারে। একে বলা হয় আন্ডারডগ এফেক্ট (Underdog Effect)। যে প্রার্থী জরিপে পিছিয়ে থাকেন তাকে সহানুভূতিসূচক ভোট দিতে এগিয়ে আসেন ভোটাররা। এর ফলে শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে থাকা প্রার্থী বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হতে পারেন।
তিন. জনমত জরিপ প্রকাশের ফলে কিছু ভোটার ট্যাকটিকাল ভোটিং (Tactical Voting) বা কৌশলগত ভোট দিতে পারে। যেমন, বৃটেনের ১৯৯৭-এর সাধারণ নির্বাচনে টোরি মন্ত্রী মাইকেল পোরটিলোর জন্য উত্তর-পূর্ব লন্ডনে এনফিল্ড-সাউথগেইট একটি নিরাপদ আসন রূপে বিবেচনা করা হতো। জনমত জরিপে জানা যায়, সেখানে লেবার প্রার্থী স্টিফেন টুইগ ক্রমেই ভোটারদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হচ্ছেন। তখন, যেসব ভোটার পোরটিলোর ঘোর বিরোধী ছিলেন, তারা তৎপর হয়ে যান টুইগ-কে জেতানোর জন্য। ওই নির্বাচনে টুইগ জেতেন। পোরটিলো রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়ে এখন কলামিস্ট ও টিভি শো প্রেজেন্টার হয়েছেন।

এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায় ভোটাভুটির আগে প্রকাশিত জনমত জরিপ জনমতকেই প্রভাবিত করতে পারে। এ কারণে রাজনৈতিক দলগুলো এবং তাদের সমর্থক মিডিয়া তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচালিত ও গৃহীত জনমত জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে। পৌরসভা মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচনের পাঁচ দিন আগে ৬ জানুয়ারি ২০১১-তে আলো-স্টারের প্রকাশিত জনমত জরিপ দু’টির একই উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু তারা সফল হয়নি। কেন?
টুইনস অফ ইভিল
সে প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে পাঠকদের মনে করিয়ে দিতে পারি যে যদিও দু’টি পত্রিকাই আলো বিচ্ছুরণ করছে (বাংলা পত্রিকাটি প্রভাতের আলো এবং ইংরেজি পত্রিকাটি রাতের আলো) তবুও এই দু’টি পত্রিকা একই মা, ট্রান্সকম ব্যবসায়িক গ্রুপের গর্ভজাত যমজ সন্তান।
যমজ সন্তান মানুষের কৌতূহল সৃষ্টি করে বহু কারণে। এ নিয়ে হলিউডে বেশ কয়েকটি মুভি হয়েছে। এই সময়ে অন্তত দু’টি মুভির কথা আমার মনে পড়ছে।
এক. টুইনস (Twins, যমজ)। ১৯৮৮-র এই মুভিতে দুই যমজ ভাইয়ের ভূমিকায় অভিনয় করেন আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগার ও ড্যানি ডি ভিটো। যারা হলিউড মুভি দেখতে অভ্যস্ত তারা জানেন শোয়ার্জেনেগার (যিনি বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের গভর্নর) লম্বা এবং ড্যানি ডি ভিটো খাটো। যমজ ভাই হলে তাদের যদিও প্রায় একই রকম দৈহিক ফিচার হওয়া উচিত ছিল, সেটা হয়নি, কারণ মুভির কলাকাহিনীতে তাদের জন্ম হয়েছিল একটি জেনেটিক এক্সপেরিমেন্টের ফলে। তাই শুধু তাদের শারীরিক আয়তনই যে ভিন্ন ছিল তা নয়, তাদের আচার আচরণও ছিল ভিন্ন। লম্বা শোয়ার্জেনেগার ছিলেন সৎ এবং খাটো ডি ভিটো ছিলেন অসৎ। লম্বা ভাই খুঁজে পান তার খাটো ভাইকে এবং তাকে সংশোধনের চেষ্টা শুরু করেন।
দুই. টুইনস অফ ইভিল (Twins of Evil, যমজ শয়তান)। ১৯৭১-এর এই মুভিতে একই চেহারার দুই যমজ ভাই ভ্যামপায়ার বা রক্তচোষার পূজারি হন।

যমজ কিন্তু ভিন্ন
আলো-স্টার টুইনস অথবা টুইনস অফ ইভিল কিনা, সেটা পাঠকরাই বিবেচনা করবেন। এখন দেখুন আলো-স্টার যমজ হওয়া সত্ত্বেও জরিপ দু’টির ক্ষেত্রে তাদের কয়েকটি ভিন্নতা।
আলো স্টার
জরিপকারী সংস্থা ওআরজি-কোয়েস্ট এসি নিলসেন
ভোটারদের পছন্দ :
আওয়ামী লীগ ৪৬% ৩৯%
বিএনপি ৩৯% ২২%
জাতীয় পার্টি ৬% ৪%
সাবটোটাল ৯১% ৬৫%

জামায়াত অজানা ২%
অন্যান্য অজানা ১%
না-ভোট দেবেন অজানা ৩%
ভোট দেবেন না অজানা ৩%
কোনো উত্তরই দেননি অজানা ২৬%
টোটাল ১০০%

লক্ষ্য করুন, ডেইলি স্টার জানিয়েছে ২৬% কোনো উত্তর দেননি এবং জামায়াতসহ অন্য চার ক্যাটেগরির ভোটাররা কী মতামত দিয়েছেন। প্রথম আলো এসব কোনো তথ্য দেয়নি এবং তাদের ট্যাবুলেশন অসম্পূর্ণ রেখেছে, অর্থাৎ টোটাল ফিগার দেয়নি।
সাবটোটালে প্রথম আলো দেখিয়েছে ৯১% উত্তরদাতার মধ্যে আওয়ামী লীগকে ৪৬% এবং বিএনপিকে ৩৯% ভোট দিতে চেয়েছে। অথচ ডেইলি স্টার দেখিয়েছে উত্তরদাতাদের মধ্যে আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে চেয়েছে ৩৯% এবং বিএনপিকে মাত্র ২২%।
যেহেতু দু’টি পত্রিকা শুধু মালিকানার ভিত্তিতেই নয়, অবস্থানগতভাবেও খুবই কাছাকাছি (ঢাকার এয়ারপোর্ট রোডে কয়েক গজ ব্যবধানে প্রায় মুখোমুখি) সেহেতু ধারণা করা যেতে পারে দু’টি পত্রিকাই জানতো ভোটিং ইনটেনশনের এই বড় ভিন্নতা। ফলাফল প্রকাশের আগে পত্রিকা দু’টির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে নিশ্চয়ই আলোচিত হয়েছিল এই ভিন্নতা বিষয়ে। শেষ পর্যন্ত তারা ভিন্ন ফলাফলই প্রকাশ করেছে তবে আওয়ামী লীগ যে এগিয়ে সেটা দু’টি পত্রিকাই বলে। অবশ্য প্রথম আলো বলে আওয়ামী লীগ ৭% এগিয়ে। আর ডেইলি স্টার বলে আওয়ামী লীগ ১৭% এগিয়ে। দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের মধ্যে ভোটিং ইনটেনশন ৭% থেকে ১৭% ব্যবধান কিছুতেই গ্রহণযোগ্য না হলেও অজানা কারণে সেভাবেই জরিপের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।

আরো দুটি ভিন্নতা
জরিপ ফলাফল প্রকাশে পত্রিকা দু’টির মধ্যে আরো দু’টি ভিন্নতা লক্ষণীয়। ডেইলি স্টার তার ক্রোড়পত্রের শেষ পৃষ্ঠায় শুধু দু’টি প্রশ্ন এবং উত্তর বড় করে চার্টে ছেপেছে। প্রথম প্রশ্নটি আগেই বলেছি, আগামীকাল যদি নির্বাচন হয় তাহলে কোন পার্টিকে আপনি ভোট দেবেন? স্টারের দ্বিতীয় প্রশ্ন ও উত্তরটি ছিল, সবশেষে আমি জানতে চাই গত নির্বাচনে কোন পার্টিকে আপনি ভোট দিয়েছিলেন। এর উত্তর ছিল :
আওয়ামী লীগ ৫৩%
বিএনপি ২০%
জাতীয় পার্টি ৩%
জামায়াত ১%
অন্যান্য ২%
না-ভোট দাতা ১%
ভোট দেননি ১০%
ভোটার ছিলেন না ১%
কোনো উত্তর দেননি ১০%
টোটাল ১০১%

লক্ষ্য করুন, এখানে টোটাল ১০০ না হয়ে ১০১ হয়েছে। প্লিজ, স্টারের এই ভুলকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখুন।
কিন্তু প্রথম আলো তাদের জরিপে এই শেষ প্রশ্নটি করেনি। অথবা করলেও উত্তর প্রকাশ করেনি। কারণ সম্ভবত এতে দেখা যায় আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় ধস নামা শুরু হয়েছে। যেমন, ডেইলি স্টারের জরিপে উত্তরদাতাদের ৫৩% গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দিলেও মাত্র ৩৯% পরবর্তী নির্বাচনে ভোট দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ, দুই বছরে ১৪% ভোটার আওয়ামী লীগ বিমুখ হয়েছে।
ডেইলি স্টার যেখানে তাদের ক্রোড়পত্রের শেষ পৃষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ দু’টি প্রশ্নের উত্তর বারচার্ট সহ ছেপেছে সেখানে প্রথম আলো দু’টি প্রশ্নেরই উত্তর চেপে গিয়েছে। প্রথম প্রশ্ন (আগামীকাল যদি নির্বাচন হয় তাহলে কোন পার্টিকে আপনি ভোট দেবেন?) এবং তার আংশিক উত্তর প্রথম আলো ক্রোড়পত্রে না ছেপে দায়সারাভাবে অন্যত্র ছেপেছে।
ডেইলি স্টারের তুলনায় প্রথম আলোর সার্কুলেশন অনেক বেশি। তাই এই দু’টি স্পর্শকাতর প্রশ্নের উত্তর বিষয়ে প্রথম আলো খুব সতর্ক থেকেছে। বলা যায়, মাইনাস টু তত্ত্বের অন্যতম প্রবক্তা প্রথম আলো সম্পাদক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরাগ প্রশমনের লক্ষ্যে এই সতর্কতা অবলম্বন করেছেন।

ভুল জনমত জরিপ
কিন্তু তাতে বাস্তবতা চাপে পড়েনি।
প্রথম আলো, ডেইলি স্টার তথা আওয়ামী লীগের জন্য কঠিন বাস্তবতা হলো ওই দু’টি জনমত জরিপের ফলাফলকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত করেছে পৌর নির্বাচন।
আলো-স্টারের জরিপের সঙ্গে তুলনা করার জন্য ভিন্ন সূত্রে আমি চেষ্টা করেছিলাম নির্বাচন কমিশনের কাছে জানতে সব পৌরসভার নির্বাচনের পূর্ণ ফলাফল। কিন্তু তারা জানিয়েছেন, পূর্ণ ফলাফল যোগ করতে কিছু সময় লাগবে। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হিসাবে জানা যায় (এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত) দেশের সাতটি বিভাগে ২৩৬টি পৌরসভায় মোট ভোট পড়েছে ৭০%। এর মধ্যে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের চাইতে বেশি ভোট পেয়েছে। বিএনপির ভোটের পরিমাণ ১,৮৫১,৩৩৭ যা প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৪১%। অন্য দিকে আওয়ামী লীগের ভোটের পরিমাণ ১,৭৮০,৫৭৫ যা প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৩৯%। ফলে এখন পর্যন্ত ঘোষিত ২৩৬ পৌরসভায় মেয়র পদে বিএনপির ৯৭ জন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। অন্য দিকে আওয়ামী লীগের ৯৩ জন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।

অথচ প্রথম আলোর জরিপ অনুযায়ী ভোট পড়লে বিএনপির ৯২ জন প্রার্থীর (অর্থাৎ ২৩৬৩৯%) এবং আওয়ামী লীগের ১০৯ জন প্রার্থীর (২৩৬৪৬%) বিজয়ী হওয়ার কথা ছিল।
আর ডেইলি স্টারের জরিপ অনুযায়ী ভোট পড়লে বিএনপির ৫২ জন প্রার্থীর (অর্থাৎ ২৩৬২২%) এবং আওয়ামী লীগের ৯২ জন প্রার্থীর (২৩৬৩৯%) বিজয়ী হওয়ার কথা ছিল।
নির্বাচন কমিশন থেকে প্রদত্ত ভোটের পূর্ণাঙ্গ হিসাব না পাওয়া পর্যন্ত, দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে উপরের এই সরলীকৃত হিসাবটি করা হয়েছে। আশা করি পাঠকরা বুঝতে পারছেন দু’টি পত্রিকার দু’টি জরিপই কতো বড় ভুল করেছে। উভয় জরিপেই বিএনপির পরাজিত হওয়ার কথা ছিল। অথচ বাস্তবে বিএনপি বিজয়ী হয়েছে।

বিএনপির ভোট আরো বেশি ছিল
এখানে আরেকটি কথা বলা উচিত। পৌরসভা নির্বাচনের অব্যবহিত আগে ৮ জানুয়ারিতে উত্তর বাংলাদেশে নির্বাচনী অভিযানে শেখ হাসিনা ও তার মহাজোটের পার্টনার জাতীয় পার্টির নেতা এরশাদ একই মঞ্চে উঠেছিলেন। সেই ১৯৮৬-তেও শেখ হাসিনা নির্বাচনী গাটছড়া বেঁধেছিলেন এরশাদের সঙ্গে। এবার লং ড্রাইভে নয়, প্লেনে শর্ট রাইডে তারা এক সঙ্গে সেখানে যান। হাসিনা ও এরশাদ উভয়েই ভেবেছিলেন এরশাদের ভোট ব্যাংক রূপে পরিচিত উত্তর বাংলায় তাদের পক্ষে বেশি ভোট পড়বে এবং সেই ব্যান্ডওয়াগন এফেক্টে পরবর্তী কয়েক দিনে অনুষ্ঠিতব্য পৌরসভা নির্বাচনে তাদের জয়লাভ সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে বিএনপির বিশাল জয়ে উদ্বিগ্ন কিছু আওয়ামী নেতা-কর্মী পরবর্তী পৌরসভা নির্বাচনে প্রচণ্ড সহিংসতার আশ্রয় নেন। যেমন, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনীতে হয়েছে। বরিশালে ভোটারদের ভীত করার সংবাদ পাওয়া গেছে। ২০টি কেন্দ্রে নির্বাচন পরিত্যক্ত হয়। এ ধরনের ঘটনাগুলো যদি না ঘটতো তাহলে বিএনপির পক্ষে আরো বেশি ভোট পড়তো এবং আলো-স্টারের জরিপ আরো বেশি ভুল রূপে প্রমাণিত হতো। এসব সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে ঘোষিত ২৩৬ পৌরসভা নির্বাচন ফলাফল হচ্ছে :
বিএনপি ৯৭
আওয়ামী লীগ ৯৩
আ.লীগ বিদ্রোহী ১৬
বিএনপি বিদ্রোহী ৮
জামায়াত ৫
জাতীয় পার্টি ১
এলডিপি ১
নাগরিক কমিটি ১
স্বতন্ত্র ১৪
টোটাল ২৩৬

ট্রানজিট দিলে লাভ কার?
প্রথম আলোর ক্রোড়পত্রে ৩৩টি প্রশ্নের উত্তর এবং ডেইলি স্টারের ক্রোড়পত্রে ৬১টি প্রশ্নের উত্তর প্রকাশিত হয়েছে। ইনডিয়াকে ট্রানজিট দেয়া প্রসঙ্গে উভয় জরিপে বলা হয়েছে, ভোটারদের মত হচ্ছে ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশ লাভবান হবে। দেখুন, দু’টি পত্রিকার প্রশ্ন ও উত্তর।
প্রশ্ন : বর্তমান সরকারের আমলে ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ কি লাভবান হবে?
উত্তর প্রথম আলো স্টার
হ্যাঁ ৫৩% ৪৬%
না ৩৮% ৯%
ইনডিয়ার লাভ হবে - ১৩%
দুই দেশের লাভ হবে - ৩%
জানি না ৯% ২৯%
টোটাল ১০০ ১০০

লক্ষ্য করুন এখানেও দুই জরিপের উত্তরে যথেষ্ট ব্যবধান আছে। প্রথম আলোর জরিপ বলেছে দেশের অর্ধেকেরই বেশি মানুষ মনে করে ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশ লাভবান হবে। ডেইলি স্টারের জরিপ বলেছে দেশের অর্ধেকের কম মানুষ মনে করে ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশ লাভবান হবে।
পৌরসভার নির্বাচনী ফলাফলে যখন দু’টি পত্রিকার জরিপ ভুল প্রমাণিত হয়েছে তখন ট্রানজিট বিষয়েও যে জরিপ দু’টি ভুল সিদ্ধান্তে এসেছে সেটা বলা যায়। কিন্তু ট্রানজিট বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং, উভয় পত্রিকারই উচিত হবে অবিলম্বে শুধু ট্রানজিট বিষয়ে একটি জরিপ করে সঠিক জনমত জানানো।

জনমত জরিপে ভুলের পরিমাণ
কোনো জনমত জরিপে কি ভুল হতে পারে না?
হ্যাঁ, ভুল হতেই পারে। তবে ফলাফল প্রকাশিত হবার পরে বিবেচনা করতে হবে ভুলগুলোর আয়তন বা পরিমাণ কতো। উন্নত দেশে ১,০০০ স্যাম্পলে ৩% মার্জিন অফ এরর (margin of error বা প্রথম আলোর ভাষায় প্রান্তিক ভুল) গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
প্রথম আলো তার রিপোর্টে বলেছে, ‘এই জরিপে প্রান্তিক ভুল ধরা হয়েছে কম বেশি ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ।’ কিন্তু বাস্তব ফলাফল তাদের এই দাবি যে কতোখানি অসার ও হাস্যকর ছিল সেটা প্রমাণ করে দিয়েছে।
ডেইলি স্টার এক্ষেত্রে সতর্কতার পরিচয় দিয়েছে। তারা তাদের রিপোর্টে বলেনি মার্জিন অফ এরর কতোখানি হতে পারে। সুতরাং তারা ধরা পড়ার হাত থেকে বেঁচে গিয়েছে।

কেন এত বড় ভুল?
কিন্তু কেন দু’টি পত্রিকারই জরিপে এত বিশাল মাপের ভুল হলো?
এর বিশদ উত্তর দিতে গেলে আমাকে আলো-স্টারের জরিপ কনসালটেন্ট রূপে কাজ করতে হবে এবং সে ইচ্ছা আমার মোটেও নেই। তবু দেশের রাজনীতি, মিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ও আলো-স্টারের গ্রহণযোগ্যতা রক্ষার চেষ্টায় কয়েকটি কারণ খুব সংক্ষেপে বলছি।

এক. ১৯৮৬-তে সাপ্তাহিক যায়যায়দিন এবং ২০০১-এ ডেমক্রেসিওয়াচ তাদের জরিপে খুব কম প্রশ্ন করেছিল ও সহজ প্রশ্ন করেছিল। সবচেয়ে বড় কথা স্যাম্পল সাইজ ছিল ৫,০০০ অথবা তার বেশি এবং দেশব্যাপী। ভাষা, খাবার অভ্যাস (ভাত-ডাল-সবজি-মাছ) ও ধর্ম (মুসলিম ৮৮%) বাদ দিলে বাংলাদেশের মানুষ হোমোজেনিয়াস নয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে কেএফসি-পিৎজা হাট জাতীয় ফাস্টফুড খাওয়া একটি বিলাসিতা, কোক-পেপসি হচ্ছে অতিথি আপ্যায়নে আন্তরিকতার চরম নিদর্শন, বিয়ার, ওয়াইন, হুইস্কি তারা দেখেনি, অ্যানুয়াল হলিডে বা বছরে কমপক্ষে দুই সপ্তাহ বিদেশে, সমুদ্র তীরে অথবা কোন হেলথ রিসর্টে ছুটি কাটানোর বিষয়টি অজানা, আকাশে প্লেন দেখেছে কিন্তু খুব কম ব্যক্তিই চড়েছে, তারা গাড়ি চড়েছে (বাসে) গাড়ির (প্রাইভেট কার) মালিক হবার স্বপ্ন খুব কম মানুষই দেখেছে, অধিকাংশ ঘরে এখনো বিদ্যুৎ-গ্যাস নেই। ফলে বাংলাদেশে বৃহত্তর জনগোষ্ঠির সঙ্গে অন্য জনগোষ্ঠির পার্থক্য অনেক এবং এই পার্থক্যটা বেড়েই চলেছে। এসব ফ্যাক্টর চিন্তা করে র‌্যানডম স্যাম্পলিং বা দৈব চয়নের পাশাপাশি সিলেকটেড স্যাম্পলিং বা সুনির্দিষ্ট চয়নও করতে হবে এবং সেসব স্যাম্পলিং হতে হবে ১০,০০০ ঊর্ধ্ব।
৩,০০০ নমুনা সংখ্যা দেশের মানুষের মতের প্রতিফলন হিসেবে কতখানি বিশ্বাসযোগ্য এ প্রশ্নের উত্তরে প্রথম আলোর জরিপকারি সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর মঞ্জুরুল হক প্রথম আলোতেই বলেছেন, ‘যথাযথ নমুনায়ন করা হলে ১,২০০ নমুনাই যথেষ্ট। জরিপের নমুনা হিসেবে এ সংখ্যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে সাধারণত ১,০০০ নমুনা নিয়ে জরিপ পরিচালনা করা হয়। জরিপের পরিধি আরও বিস্তৃত এবং জনমতের প্রতিফলন আরও বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য আমরা ৩,০০০ নমুনা নিয়েছি। এটাকে আমরা যথেষ্ট বলে মনে করি। নমুনায়নে দৈব চয়ন পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে সব শ্রেণীর, সব স্তরের জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে।’
কিন্তু আমেরিকানদের মধ্যে অর্থনৈতিক পার্থক্য অনেক বেশি থাকলেও ধরা যায়, তাদের কাছে কেএফসি-পিৎজা হাট-ম্যাকডোনাল্ডস প্রভৃতি জাংক ফুড, কোক-পেপসি পানির মতো সাধারণ ড্রিংক, বিয়ার, ওয়াইন, হুইস্কি কমবেশি সবাই জীবনে এক সময়ে খেয়েছেন, অ্যানুয়াল হলিডে জীবনের একটি অংশ, প্লেনে চড়াটা, টাকার বিষয় নয় শুধু ইচ্ছার বিষয়, প্রাইভেট কার চালাতে এবং মালিক হতে পারেন অনেকে এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস বিহীন জীবন অকল্পনীয়। অর্থাৎ এসব ক্ষেত্রে আমেরিকানরা হোমোজেনিয়াস। শুধু তাই নয়, দেখা যাবে কোনো পাড়ায় একই রাস্তায় প্রায় বাড়িই একই ধরনের এবং সেখানে প্রায় একই ইনকাম রেঞ্জের মানুষ থাকে।
কিন্তু বাংলাদেশে শহরে বাড়ির পাশেই থাকে বস্তি যাদের কোনো নাম্বার নেই। আমি নিজে থাকি ইস্কাটন গার্ডেনস-এ যে রাস্তাটির এক মাথায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মা ও হোলি ক্রিসেন্ট হসপিটাল, মাঝখানে একটি স্কুল, লেডিস ক্লাব, পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ও ফার্স্ট ক্লাস অফিসার্স কোয়ার্টার্স এবং অন্য মাথায় নৌবাহিনী প্রধানের সরকারি বাসভবন নৌভবন। এই রাস্তাতেই আমার গেইটের সামনের ফুটপাথে এবং বিপরীত ফুটপাথেও গড়ে উঠেছে ছিন্নমূল মানুষের নীল পলিথিনে ঢাকা আস্তানা। অর্থাৎ এই রাস্তার অধিবাসীরা হোমোজেনিয়াস নন এবং এখানে দৈব চয়নের ভিত্তিতে জনমত জরিপ করলে দেশের মানুষের মতের প্রতিফলন ঘটবে না।
দুই. বেশি প্রশ্ন করা উচিত হবে না। এমন প্রশ্ন করা উচিত হবে না, যা ভোটারদের বোধগম্য না-ও হতে পারে অথবা প্রশ্নটির বিষয়ে ভোটাররা সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকতে পারেন। যেমন ধরুন প্রথম আলোর দু’টি প্রশ্ন।
১. শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ সফল নাকি ব্যর্থ হয়েছে? এই প্রশ্নটির উত্তর কি একজন নিরক্ষর চাষী দিতে পারবেন? তিনি হয়তো বলবেন জানি না এবং সেই উত্তর হবে বেশি। অথচ প্রথম আলোর পাই চার্টে দেখানো হয়েছে মাত্র ১% উত্তরদাতা বলেছেন ১% জানি না!
২. পরের প্রশ্নটি হচ্ছে, বর্তমান সরকারের আমলে কৃষি খাতে সরকারের নেয়া পদক্ষেপে কৃষক কি লাভবান হয়েছে? এই প্রশ্নটির উত্তর শহরের ডিজুস প্রজন্মের তরুণরা এবং আরো অনেক শহরবাসী দিতে পারবে না। অথচ এই প্রশ্নের উত্তরে প্রথম আলোর বার চার্টে দেখানো হয়েছে মাত্র ২% উত্তরদাতা বলেছেন জানি না!
আলো-স্টারের উচিত ছিল এত বহুমুখী বিষয়ে প্রশ্ন না করে সীমিত বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সেক্টরাল ভোটারদের প্রশ্ন করা। যেমন, শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষক, ছাত্র ও অভিভাবকদের প্রশ্ন করা। যেমন, কৃষি বিষয়ে কৃষক ও কৃষিকাজে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন করা।
আলো-স্টারের এই খিচুড়ি প্রশ্নমালায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সুশাসন ও অর্থনীতি, সরকারের কর্মকাণ্ড, সরকারের দলীয়করণ, জীবনযাত্রার মান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গণমাধ্যমের প্রতি সরকারের মনোভাব, গত দুই বছরে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বিরোধী দলগুলোর মনোভাব, গত দুই বছরে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের কর্মকাণ্ড, আওয়ামী লীগের ভূমিকা, বিরোধী দলের ভূমিকা, ট্রানজিট, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বিচার বহির্ভূত হত্যা, সংবিধান, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, দ্রব্যমূল্য, খালেদা জিয়ার বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।

তিন. দুটি জরিপে দেখা গেছে, কয়েকটি বিষয়ে গত দুই বছরের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরার জন্য প্রশ্ন করা হয়েছে। কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর খুবই সাসপেক্ট বা সন্দেহজনক। লন্ডনে আমি যখন জিকরারকে দিয়ে প্রতি সপ্তাহে রেডিও স্টেশনের জনপ্রিয়তা বোঝার তুলনামূলক চিত্র জানার জন্য জরিপ করতাম তখন সেটা করা হতো রোলিং স্যাম্পল (Rolling Sample)-এর ভিত্তিতে। অর্থাৎ, ধরুন ১,২০০ উত্তরদাতার কাজে প্রথম সপ্তাহে প্রশ্ন করা হলো। দ্বিতীয় সপ্তাহে এদের মধ্য থেকে ১০০ জনকে বাদ দিয়ে নতুন ১০০ উত্তরদাতা যোগ করে তাদের প্রশ্ন করা হতো। এভাবে নতুন উত্তরদাতা সংযোজিত হলেও উত্তরের মধ্যে একটা ধারাবাহিকতা রেখে তুলনামূলক সাপ্তাহিক চিত্র পাওয়া যেত।
আলো-স্টারের জরিপ কাজের দুর্বলতা বিষয়ে বিস্তারিত সমালোচনা করতে গেলে আমাকেও একটি ক্রোড়পত্র প্রকাশ করতে হবে। সে কাজটি আমি করবো না।
প্রশ্ন উঠতে পারে কেন এত বিশাল খরচ করে ও ক্রোড়পত্র ছেপে অবাস্তব, অবিশ্বাস্য ও অগ্রহণযোগ্য দু’টি জনমত জরিপ করলো আলো-স্টার?

অনির্বাণ রাজনৈতিক অভিলাষ
এর উত্তর হতে পারে পত্রিকা দুটির সম্পাদক দুজনের অনির্বাণ রাজনৈতিক অভিলাষ। পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে এই সম্পাদক দুজন ছিলেন মাইনাস টু ফর্মুলার প্রবক্তা এবং ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম স্রষ্টা।
বলা যায় এখন বাংলাদেশে তিনটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিরাজ করছে।
এক. বিএনপি ও তার সমমনা দল। দুই. আওয়ামী লীগ ও তার সমমনা দল। এবং তিন. ওয়ান-ইলেভেনের প্রবক্তা যেখানে আছেন মিডিয়ার একাংশ, সুশীল সমাজের একাংশ এবং সম্ভবত সেনা অফিসারদের একাংশ।
১৯৯১-এর পর বিএনপি তিনবার সরকার গঠনের সুযোগ পেয়েছে। আওয়ামী লীগ দুইবার সরকার গঠনের সুযোগ পেয়েছে। সুতরাং ওয়ান-ইলেভেন প্রবক্তারা অর্থাৎ তৃতীয় শক্তি আরেকবার সরকার গঠনের অভিলাষ পোষণ করতেই পারেন। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ব্যর্থ হলে বিএনপিকে আবার ক্ষমতায় তারা আসতে দিতে চান না বলেই এসব তথাকথিত জনমত জরিপ প্রকাশ করা হচ্ছে। এই তৃতীয় শক্তি বলেই চলেছে আওয়ামী লীগ ফেইল করেছে এবং বিএনপির প্রতিও মানুষ সন্তুষ্ট নয়। আর তাই, প্রথম আলোর জনমত জরিপ বিষয়ক ক্রোড়পত্রে শিরোনাম ছিল, ‘রাজনীতি নিয়ে মানুষের হতাশা বেড়েছে।’

ডেইলি স্টার জানিয়েছে এটি ছিল এই পর্যায়ে তাদের চতুর্থ জনমত জরিপ। ধারণা করা যায়, আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে এই ধরণের আরো জরিপ করবে আলো-স্টার। তারা চাইবে দ্বিতীয় ওয়ান-ইলেভেনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে। কিন্তু আমি আশা করি গত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের ব্যর্থতার পর তাদের সুবুদ্ধির উদয় হবে।
গত ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে তাদের হাতে ট্রাম্প কার্ড (তারা মনে করেছিল) বা তুরুপের তাশ আছেন নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস। কিন্তু তিনি তাদের প্রস্তাব নাকচ করে দেন এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের এক মধ্যম শ্রেণীর সাবেক আমলা ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ-কে (যার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য আমৃত্যু চাকরি করে যাওয়া) তাদের ফ্রন্টম্যান বা কলের পুতুল রূপে নিয়োগ দানের সাজেশন দেন। এখন ওয়ান-ইলেভেন প্রবক্তাদের ড. ইউনূসও নেই, ড. ফখরুদ্দীনও নেই। তারা কাকে সেনাসমর্থিত বেসামরিক সরকার প্রধান করবেন? তাই তারা যদি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন হন তাহলে এই ধরণেরর ক্যু ও কুঅভিলাষ থেকে নিজেদের ঊর্ধ্বে রাখবেন। গণতন্ত্র, সেটা যতই খোড়া হোক না কেন, তাকে আরো সুযোগ দিতে তারা সচেষ্ট হবেন।
ও হ্যাঁ।

পৌরসভা নির্বাচনের প্রথম পর্যায় শেষ হবার পরে ডেইলি স্টারের (১৫ জানুয়ারি ২০১১) প্রথম পৃষ্ঠায় হেডলাইন ছিল AL surprised at BNP’s gain (আওয়ামী লীগ বিস্মিত বিএনপির সুফলে)।
যদি আমরা স্টারে এর মাত্র নয় দিন আগে প্রকাশিত জনমত জরিপের ফলাফল বিবেচনা করি, তাহলে বলতেই হবে ওই হেডলাইনটি হওয়া উচিত ছিল, Star surprised at BNP’s gain (স্টার বিস্মিত বিএনপির সুফলে)।
কিন্তু না।
স্টার হয়তো সারপ্রাইজড না হয়ে, অন্য কিছু হয়েছে।
কি সেটা?
একটা গল্প মনে পড়ছে।

আমেরিকান লেক্সিকোগ্রাফার নোয়াহ ওয়েবস্টার (১৭৫৮-১৮৪৩) চিরখ্যাত হয়ে আছেন বিভিন্ন ডিকশনারি লেখার জন্য। তার লেখা এ কমপেনডিয়াম ডিকশনারি অফ দি ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ (১৮০৬), ইংলিশ গ্রামার (১৮০৭) এবং দুই খণ্ডে আমেরিকান ডিকশনারি অফ দি ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ (১৮২৮), এখন যেটি ওয়েবস্টার্স নিউ ইন্টারন্যাশনাল ডিকশনারি অফ দি ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ নামে পরিচিত) প্রতিটি ইংরেজি ভাষী লেখকের জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয়।
নোয়া ওয়েবস্টারের স্ত্রী ছিলেন সুন্দরী ও পুরুষমোহন রমণী।
একদিন দুপুরে অতি অপ্রত্যাশিতভাবে নোয়া বাড়িতে ফিরে এসে তার বেডরুমে আবিষ্কার করলেন তারই এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে মিথুনরত তার স্ত্রী।
নোয়ার বন্ধু কোনো রকমে বিছানার চাদরে নিজেকে ও নোয়ার স্ত্রীকে ঢেকে, বিছানায় শুয়েই নোয়াকে বললেন, আই বেট, তুমি সারপ্রাইজড হয়েছ (আমি বাজি ধরছি তুমি নিশ্চয়ই বিস্মিত হয়েছ!)।
সঠিক শব্দ চয়নে খুব খুঁৎখুতে নোয়া উত্তর দিলেন, নো, আই অ্যাম নট। ইউ আর সারপ্রাইজড। আই অ্যাম অ্যাসটাউন্ডেড (না, আমি নই। তুমি বিস্মিত হয়েছ! আমি স্তম্ভিত হয়েছি।’
স্টার হয়তো স্তম্ভিত হয়েছে।

২৩-০১-২০১১
শফিক রেহমান : লেখক, সম্পাদক এবং টিভি অনুষ্ঠান উপস্থাপক।

উইকিলিকস থেকে হিলারিলিক


shafik-rehman111গত ২৮ নভেম্বর ২০১০ থেকে ওয়েবসাইট উইকিলিকস ও তার সহযোগী পাঁচটি আন্তর্জাতিক দৈনিক পত্রিকা ধারাবাহিকভাবে আমেরিকান গোপন কূটনীতিক বার্তা প্রকাশ শুরু করে। বিশ্ব জুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বিশ্ব রাজনীতি নতুন চেহারায় প্রতিভাত হয়। কম্পিউটারের মাধ্যমে বিনিময়কৃত এসব তথ্য ছিল অতি গোপনীয়। উইকিলিকস সেসব ফাঁস করে দেয়ায় বিশেষত আমেরিকান সরকার খুব বিব্রত হয়েছে। এখন চলতিভাবে এসব বার্তা পরিচিত হয়েছে সিক্রেট আমেরিকান ডিপ্লম্যাটিক কেবলস (Cables) নামে। সংক্ষেপে উইকিলিকস নামে। উইকিলিকসের ফাঁস করা এসব তথ্যবহুল আলোচিত হলেও তার সত্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।
কিন্তু ১৬ জানুয়ারি ২০১১-তে প্রকাশিত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ওয়াশিংটন থেকে আমেরিকার সেক্রেটারি অফ স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) হিলারি ক্লিনটনের টেলিফোন আলাপ সত্য কি না তা নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন মহলে জোরালো আলোচনা চলছে। এই টেলি-কথার ট্রান্সক্রিপ্টের ফটোকপি পাওয়া যাচ্ছে এবং এর কিছু অংশ ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ, বাংলা দৈনিক মানবজমিন ও ইংরেজি সাপ্তাহিক হলিডে-তে প্রকাশিত হয়েছে। অন্য পত্রিকাগুলো এই ট্রান্সক্রিপ্ট ছাপেনি।
হিলারি-হাসিনা টেলি-কথার ট্রান্সক্রিপ্ট, যাকে সংক্ষেপে বলা যায় হিলারিলিক, সেটা প্রকাশ না করার কারণ হতে পারে এর সত্যতা সম্পর্কে সংশয়। আওয়ামী লীগ সমর্থকরা হিলারিলিক-কে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। অন্য দিকে, বিএনপি সমর্থকদেরও কেউ কেউ হিলারিলিকের সত্যতা বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করেছেন।
সুতরাং, আসুন বিবেচনা করা যাক হিলারিলিক সত্য কি না।

তার আগে আমি সাম্প্রতিক সময়ের একজন সেরা স্যাটায়ার ও রাজনৈতিক কলাম লেখক, আর্ট বুখওয়াল্ড (Art Buchwald)-এর বিষয়ে কিছু বলে নিতে চাই। নিউ ইয়র্কে বসবাসকারী একটি গরিব অস্ট্রীয়ান-হাংগেরিয়ান ইহুদি পরিবারে ১৯২৫-তে জন্ম হয়েছিল আর্ট বুখওয়াল্ডের। তাকে একটি এতিমখানায় ভর্তি করে দিয়েছিলেন তার পিতা, যিনি ছিলেন দরজি। পরে তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হলেও ১৭ বছর বয়সে তিনি পালিয়ে যান এবং সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হবার পরে তিনি সাংবাদিকতা ও লেখালেখিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। এক পর্যায়ে তিনি আমেরিকা থেকে ইওরোপে চলে যান। সেখানে প্যারিসে ১৯৪৯-তে দি নিউ ইয়র্ক হেরাল্ড ট্রিবিউনের ইওরোপিয়ান সংস্করণের সম্পাদকীয় স্টাফ পদে যোগ দেন। এর পর থেকে তিনি তার রসালো কিন্তু তীক্ষ্ণ, ব্যঙ্গাত্মক কিন্তু মানবতাবোধসম্পন্ন, ঝরঝরে ভাষা কিন্তু বিশ্লেষণমুখী বিভিন্ন ধরনের কলামের জন্য বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ১৯৬২-তে বুখওয়াল্ড ফিরে যান আমেরিকায়। ট্রিবিউন মিডিয়া সিনডিকেট তার লেখা আটলান্টিকের উভয় তীরে একযোগে ৫৫০টি পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করতে থাকে। বুখওয়াল্ডের কলাম একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। রসবোধসম্পন্ন ও রাজনীতিকভাবে উদার, আর্ট বুখওয়াল্ডের কলাম অবশ্য পাঠ্য হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৮২-তে বুখওয়াল্ড পান পুলিৎজার প্রাইজ।
বুখওয়াল্ডের লেখার সঙ্গে আমি পরিচিত হই আশির দশকের শুরুতে। ১৯৭৯-তে লন্ডন থেকে ঢাকায় ফিরে এসে আমি ভালো দৈনিক পত্রিকার তীব্র অভাব অনুভব করছিলাম। তখন বিদেশের খবর জানার জন্য শর্ট ওয়েভে বিবিসি রেডিও-র ওপর নির্ভর করতে হতো। সেই সময়ে ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন পড়া শুরু করি এবং সেখানে বুখওয়াল্ডের কলাম আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। লক্ষ্য করি, তিনিই একমাত্র কলাম লেখক, যিনি বাস্তব ঘটনার সঙ্গে কল্পনার মিশ্রণ ঘটিয়ে বিভিন্ন চরিত্রের সংলাপ লিখতে পারেন। তার সব লেখাই যে এই ধরনের সংলাপনির্ভর ছিল, তা নয়। কিন্তু প্রায়ই তিনি সংলাপ-নির্ভর ব্যঙ্গাত্মক কলাম লিখতেন। বলা হয়, গালিভার্স ট্রাভেলস-এর লেখক জোনাথন সুইফট (১৬৬৭-১৭৪৫)-এর পরে আর্ট বুখওয়াল্ড-ই বিশ্বের সেরা পলিটিকাল স্যাটায়ার লেখক।
এপ্রিল ১৯৮০-তে যখন ঢাকায় সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানীতে আমি যায়যায়দিন নামে একটি রাজনৈতিক কলাম লেখা শুরু করি, তখন মাঝে মাঝে আর্ট বুখওয়াল্ডের সংলাপ-নির্ভর টেকনিক অনুসরণ করি। অক্টোবর ১৯৮৪-তে যায়যায়দিন নামে যখন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করি, তখন মাঝে মাঝে সংলাপ-নির্ভর লেখা দিনের পর দিন কলামে প্রকাশ করতাম। এটি পাঠকের প্রিয় হলেও শাসকের অপ্রিয় হয়। জুলাই ১৯৮৬-তে সাপ্তাহিক যায়যায়দিন নিষিদ্ধ হয়ে যাবার অন্যতম কারণ ছিল দিনের পর দিন কলামে তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর কল্পিত সংলাপ। আমাকে নির্বাসনে যেতে হয়।
কল্পিত রাজনৈতিক সংলাপ লেখা ও প্রকাশ করা যে খুব বিপজ্জনক হতে পারে সেটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় বুঝি। এই ঝুঁকি কীভাবে এড়ানো সম্ভব সেটা জানার জন্য আমি আরো নিয়মিতভাবে আর্ট বুখওয়াল্ডের কলামগুলো পড়ি। আমি সিদ্ধান্তে আসি যে, কল্পিত রাজনৈতিক সংলাপ লিখতে হলে সংশ্লিষ্ট চরিত্রদের সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকতে হবে, কল্পনাশক্তি হতে হবে প্রখর এবং এই ধরনের লেখায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অর্থাৎ, কল্পিত রাজনৈতিক সংলাপ লেখা একটি ডিফিকাল্ট আর্ট।
আর সেজন্যই আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও বাংলাদেশে অনেক ভালো ও শক্তিশালী কলাম লেখক থাকলেও কল্পিত রাজনৈতিক সংলাপ লিখিয়ে ভালো স্যাটায়ারিস্ট নেই।

এই যুক্তিতেই হয়তো বলা যায়, হিলারিলিক কোনো কল্পিত টেলি-কথা নয়। কারণ ইংরেজি ভাষায় এ রকম টেলি-কথা কল্পনাকারী, যাকে অবশ্যই আমেরিকা-বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞ হতে হবে তার কোনো অস্তিত্ব আমরা জানি না। যদি এ রকম কল্পনাশক্তির অধিকারী আমেরিকা-বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞ রাজনৈতিক কলাম লেখক থাকতেন, তাহলে তার লেখালেখির সঙ্গে আমরা ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই পরিচিত থাকতাম। সে রকম কোনো লেখক নেই বলেই ধরা যেতে পারে, হিলারিলিক কল্পিত সংলাপনির্ভর নয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন হিলারিলিককে সত্য বলে মেনে নিতে অনেকে দ্বিধান্বিত হচ্ছেন?

এর উত্তর দিতে হলে বিবেচনা করতে হবে হিলারিলিকের বিষয়বস্তুগুলো কী? পড়ুন তাহলে।
এক. প্রাথমিক সৌজন্য বিনিময়ের পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বলেন, ‘আমেরিকার অ্যামবাসাডর-অ্যাট-লার্জ স্টিফেন র‌্যাপ-কে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে দিল্লির অনুরোধে। ভ্রমণকারী রাষ্ট্রদূত র‌্যাপ ও ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মরিয়ারর্টি-র রিপোর্ট আমি পেয়েছি। যথার্থভাবে মানব অধিকার রক্ষায় আমি এবং প্রেসিডেন্ট ওবামা উভয়েই আগ্রহী। আর সেজন্যই আপনাকে জানাতে চাইছি, যে ফর্ম ও বিষয় নিয়ে বিচার চলছে, সেটাকে আমেরিকা সমর্থন করে না। (বিচারের) পুরো পদ্ধতিটা বাংলাদেশকে এমনভাবে বদলাতে হবে এটা যেন বিরোধীদের শাস্তি দেয়ার বাহক না হয়।’
মন্তব্য : ১৩ জানুয়ারিতে ঢাকায় একটি প্রেস ব্রিফিংয়ে রাষ্ট্রদূত র‌্যাপ যুদ্ধাপরাধের বিচার উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ করার জন্য ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। সুতরাং এটা নতুন কোনো তথ্য নয়। নতুন তথ্যটা হচ্ছে দিল্লির অনুরোধে রাষ্ট্রদূত র‌্যাপকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল।

দুই. হিলারির এই কথার উত্তরে হাসিনা বলেন, ‘আমার আইনমন্ত্রীকে রাষ্ট্রদূত র‌্যাপের বক্তব্য নোট করার জন্য ইতিমধ্যেই বলেছি। আমরা দিল্লির সক্রিয় সমর্থন ও সাহায্যে এই বিচারকাজে হাত দিয়েছি। আমি নিশ্চিত যে, ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইনডিয়ান রাষ্ট্রদূত এ বিষয়ে আপনাকে আরো জানাবেন।”
মন্তব্য : দিল্লির সক্রিয় সমর্থন ও সাহায্যে যে হাসিনা এই বিচারকাজ শুরু করেছেন সেটা অনেকেই মনে করতেন। তবে নতুন জানা গেল, এই নেটওয়ার্কে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইনডিয়ান রাষ্ট্রদূত আছেন।
তিন. এরপর হিলারি বলেন, “আমেরিকার যে মূল্যবোধ ও নীতিমালা আছে সেসব দিল্লির মতো হতে পারে না-ও হতে পারে। আমরা দিল্লির বেশির ভাগ মতামতের প্রতি গুরুত্ব দেই। তবে এই প্রসঙ্গটা (ভিন্ন), তাই আমি ভেবেছি আপনাকে আগেই সেটা বলা উচিত।”
এর উত্তরে হাসিনা বলেন, ‘আপনার উদ্বেগটা বুঝেই বলছি। এসব আমাদের (নির্বাচনী) ম্যানিফেস্টোতে ছিল এবং জনগণ চায় এই বিচারটা যেন চলে।’
মন্তব্য : এটা নতুন কিছু নয়। হাসিনা সব সময়ই বলে এসেছেন জনগণ এই বিচার চায়।
চার. হিলারি তখন বলেন, “অবশ্যই। কিন্তু সেটা এমনভাবে হতে হবে যেন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়। তবে আমাদের মনে হয়, ত্রুটিপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফর্ম বা কায়দায় সেটা হলে, এমনকি যারা আপনার পার্টিকে ভোট দিয়েছেন তাদের কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে না। বিশ্বের যে অঞ্চলে আপনার দেশটি অবস্থিত সেখানে শান্তি আনার জন্য প্রেসিডেন্ট ওবামা খুব পরিশ্রম করছেন। সুতরাং আমেরিকা এমন কোনো কাজ করতে দেবে না, যার ফলে কিছু বৈধ রাজনৈতিক শক্তিকে গোপনে কাজ করতে হতে পারে। কারণ তার ফলে সেটা আপনার জন্য এবং আমাদের জন্যও আরো সমস্যার সৃষ্টি করবে।”
হাসিনা এর উত্তরে বলেন, “এ নিয়ে আপনি দুর্ভাবনা করবেন না। এটাকে তেমন সিরিয়াসলি নেবেন না। আমরা এটা (বিচার) করছি, কারণ এটা আমাদের করতে হবে। এখানে কিছু দোষী মানুষ আছে, যাদের সোজা করতে হবে।”
মন্তব্য : আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি কিছুটা বদলে গেছে। তারা চায় না সন্ত্রাসীদের দমনের অজুহাতে ধর্মভিত্তিক মুসলিম দলগুলোর ওপর কোনো অত্যাচার হোক। আমেরিকা এখন জানে এই ধরনের দমন-পীড়ন নীতির ফলে ধর্মভিত্তিক মুসলিম দলগুলো আত্মগোপন করলে তারা নাশকতামূলক কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য হতে পারে। এবং যেহেতু আন্তর্জাতিক চলাচল এখন সহজ সেহেতু নাশকতার কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বাংলাদেশ থেকে আমেরিকাতেও হাজির হয়ে ধ্বংসাত্মক কাজ করতে পারে। সুতরাং আমেরিকা চায় খোলামেলা রাজনীতিতেই ধর্মভিত্তিক দলগুলো অংশ নিক। লক্ষণীয় যে, হাসিনা তাকে প্রবোধ দেয়ার জন্য বলেছেন বিষয়টা অত সিরিয়াসলি না নিতে। কিন্তু জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করার মাধ্যমেই বোঝা যায়, বিষয়টি হাসিনা সিরিয়াসলিই নিয়েছেন।

পাচ. এরপর হিলারি বলেন, “রাষ্ট্রদূত র‌্যাপ আমাকে আরো জানিয়েছেন, বিচার বিভাগের (জুডিশিয়ারি) ওপর আপনার সরকারের প্রভাবের বিষয়টি তিনি আমাকে বলেছেন, আপনি যেভাবে চান সেভাবেই বিচার বিভাগ রায় দিচ্ছে। এর পরিণতি ভালো হয় না। এ বিষয়ে আপনার সতর্ক হওয়া উচিত।”
হাসিনা তখন বলেন, “ধন্যবাদ। আপনার ও প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের মতামতকে আমি সব সময়ই দাম দেই।”
মন্তব্য : বর্তমান সরকার যে বিচার বিভাগকে সাজিয়েছে সেটা সর্বজনবিদিত। আমেরিকাও সেটা জেনে গেছে। তাই হিলারি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এর পরিণাম অশুভ হয়।

ছয়. এরপর হিলারি বলেন, “যে জন্য আমি আপনাকে ফোন করেছি সেই মোদ্দা কথাটা বলতে চাই। ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতি আপনি যে আচরণ করছেন সে বিষয়ে এমনকি (দৈনিক) ওয়াশিংটন পোস্টও যে লিখেছে সেটা আপনি দেখেছেন। আমি ভাবলাম আপনাকে জানানো উচিত এ জন্য ওয়াশিংটনে আমরা কতটা ক্ষুব্ধ হয়েছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছি, কারণ নোবেল প্রাইজ পাওয়ার অনেক আগেই ক্লিনটন পরিবারের পারিবারিক বন্ধু ছিলেন ড. ইউনূস। আমার মতোই প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনও দুঃখ পেয়েছেন। আশা করি আপনি জানেন, ড. ইউনূস যেন এই পুরস্কারটি পান সেজন্য তিনি কত খেটেছেন। আমি জানি, মানুষের কিছু ব্যক্তিগত ইসু থাকতে পারে। কিন্তু ড. ইউনূসের বিষয়টা জাতীয়। তিনি একজন জাতীয় ব্যক্তিত্ব। আমি মনে করি, দেশের একমাত্র নোবেল লরিয়েটকে শয়তান রূপে চিহ্নিত করা (Demonize) বাংলাদেশের উচিত নয়।’
হিলারির কথা এই পর্যায়ে হাসিনা থামিয়ে দিতে চাইলে হিলারি বলেন, “আগে আমার কথা শেষ করতে দিন। আশা করি, আপনি জানেন প্রেসিডেন্ট ওবামা ক্ষুদ্রঋণ (মাইক্রো ক্রেডিট)-এর একজন বড় গুণগ্রাহী। প্রেসিডেন্ট ওবামার মা যখন মাইক্রো-ফাইনান্সের ওপর থিসিস লেখেন, তখন থেকেই তিনি এর গুণগ্রাহী। তাই আমি আপনাকে এই ফোন কল দিয়ে জানাতে চাইছি, ড. ইউনূসকে শয়তান রূপে চিত্রিত করার (Demonize) আপনার অব্যাহত প্রচেষ্টায় আমি এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ওবামা উভয়েই কতটা ক্ষুব্ধ হয়েছি।”
হাসিনা তখন আত্মরক্ষার জন্য বলেন, “আমরা তো এই ইসুটা তুলি নি। আশা করি আপনি জানেন এই ইসুটা প্রথম তুলেছিল নরওয়ে। তারা অভিযোগ করেছিল ড. ইউনূস ফান্ড অন্যত্র সরিয়ে ফেলেছেন। তা ছাড়া, এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং আমাদের নিয়মনীতি অনুযায়ী এর সুরাহা আমরা করব।”
মন্তব্য : ড. ইউনূসের নোবেল প্রাইজ প্রাপ্তির অনেক আগেই ক্লিনটন পরিবারের সঙ্গে যে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল সেটা সবাই জানেন। বিল ক্লিনটন যে ড. ইউনূসের নোবেল প্রাইজ প্রাপ্তির বিষয়ে কাজ করেছিলেন সেটাও কেউ কেউ অনুমান করেছিলেন। নতুন যেটা জানা গেল সেটা হচ্ছে, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ওবামার মা-ও ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ে থিসিস লিখেছিলেন এবং তখন থেকে ওবামা-ও হয়েছেন ড. ইউনূসের ফ্যান। লক্ষণীয় যে, ড. ইউনূসকে হয়রানির বিষয়ে হাসিনা দায়ী করেছেন নরওয়ের উদ্যোগকে। কিন্তু বলেননি যে, নরওয়ে এ বিষয়ে আগেই তদন্ত করে নির্দোষ জেনে তারপর ড. ইউনূসকে নোবেল প্রাইজ দিয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন নি নরওয়ের টেলিভিশনে একটি ডকুমেন্টারি মুভিতে মূলত ক্ষুদ্রঋণের তাত্ত্বিক দিকটির সমালোচনা করে বলা হয়েছিল যে, এতে গরিবদের উপকার হয় না। ওই ডকুমেন্টারির মূল সমালোচনা ছিল ক্ষুদ্রঋণের উপকারিতা বিষয়ে, ড. ইউনূসের ফান্ড ট্রান্সফার বিষয়ে নয়। কিন্তু এসব তথ্য হাসিনা চেপে গেলেও হিলারি ঠিকই জানতেন।

সাত. তাই এরপর হিলারি বলতে বাধ্য হন, “আমি ভেবেছিলাম আমাকে এত দূর যেতে হবে না। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, আমি ভুল ভেবেছিলাম। আপনি জানেন এবং আমরাও জানি কীভাবে আপনার সরকার ক্ষমতায় এসেছে। ভুলে যাবেন না, নির্বাচনের পর আমরা বলেছিলাম, সেটা অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে এবং আপনাকে সাহায্য করেছিলাম। প্রধানমন্ত্রী, আপনি জানেন দিল্লিতে আমাদের বন্ধুদের নির্দেশে কীভাবে ফলাফল আগেই ঠিক করা হয়েছিল। তারা যেভাবে চেয়েছিল সেভাবেই আমরা চলেছিলাম। প্লিজ, আপনি এটাও ভুলে যাবেন না যে, জেনারেল মইন যিনি আপনাকে ক্ষমতায় এনেছিলেন তিনি এখন আমেরিকাতে আছেন এবং আপনি যতখানি কল্পনা করতে পারেন, তার চেয়েও বেশি এখন আমরা জানি। আমি বলছি না যে, আমরা এখনই আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যাব। আমি শুধু ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন ইসু তুলে ধরছি।”
হিলারির এই কড়া কথায় হাসিনা দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, “আমরা আপনার সমর্থন ও সাহায্য বিষয়ে জানি। আপনাকে খুশি রাখার চেষ্টা করব। দুশ্চিন্তা করবেন না। আপনার কথাগুলো মনে রাখব। এখন বলুন, কবে আমাদের দেশ সফর করতে আসবেন?”
প্রতি উত্তরে হিলারি শুধু বলেন, “আমন্ত্রণের জন্য ধন্যবাদ। আপনি যে সময় দিলেন সেজন্য ধন্যবাদ।”
এরপর হাসিনা বলতে থাকেন, “প্লিজ প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনকে, আপনার মেয়েকে, জামাইকেও সঙ্গে নিয়ে আসবেন।”
ততক্ষণে হিলারি ফোন ছেড়ে দিয়েছেন।
মন্তব্য : জেনারেল মইন ও ইনডিয়ার সাহায্য ও সমর্থনে আওয়ামী লীগ যে গত নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল সেটা তখন অনেকেই বুঝেছিলেন। তবে জানা ছিল না, এর পেছনে আমেরিকার সমর্থন কতখানি। হিলারি-হাসিনার এই টেলিটক থেকে বেরিয়ে আসা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দুটি হচ্ছে :
এক. নির্বাচনের ফল আগেই ঠিক করা ছিল এবং
দুই. তাতে আমেরিকান সমর্থন ছিল।

তাহলে এই ছিল হিলারিলিকের সারাংশ।
যারা বলছেন এটি নির্ভরযোগ্য নয়, তাদের প্রধান দুটি যুক্তি হচ্ছে, এই তথ্যের সোর্স বা সূত্রটির পূর্ণ পরিচয় নেই এবং হিলারির ভাষা আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মানানসই নয়।
প্রথমে বিবেচনা করা যাক সোর্সটি। ফেইসবুকে রবিবার ১৬ জানুয়ারি ২০১১-তে সকাল ১০.২৮ মিনিট বা সাড়ে দশটায়। এটি প্রকাশ করে হিডেন ট্রুথ (Hidden Truth) বা গোপন সত্য। বলা বাহুল্য, এটি প্রকাশকের ছদ্ম নাম। বোধগম্য কারণেই এই প্রকাশক উইকিলিকসের জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের মতো কোনো ঝুঁকি নিতে চান না। তাই ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন।
এটি প্রকাশের তারিখ ও সময়টি বিবেচনা করুন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ শনিবার ১৫ জানুয়ারিতে জানান, সেদিন বাংলাদেশ টাইম সকাল সাড়ে ন’টায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন টেলিফোন করেছিলেন। তখন ওয়াশিংটনে সময় ছিল শুক্রবার ১৪ জানুয়ারি রাত সাড়ে দশটা। এরপর রবিবার ১৬ জানুয়ারি ওয়াশিংটন ডিসি টাইম সকাল সাড়ে দশটায় ফেইসবুকে এই টেলি-কথার ট্রান্সক্রিপ্ট প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ, ওয়াশিংটন থেকে ফোন কল করার ঠিক ৩৬ ঘণ্টা পরে।
ধারণা করা হচ্ছে, এই ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে স্টেট ডিপার্টমেন্ট জেনে যায় হিলারির বক্তব্যকে সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে হাসিনার প্রেস সচিব বর্ণনা করেছেন। রোববার ১৬ জানুয়ারিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিকে এই ফোনালাপের খবর প্রকাশিত হয় এবং তাতে বলা হয় ভূয়সী প্রশংসার পাশাপাশি বিভিন্ন ইসুতে বাংলাদেশ ও আমেরিকা একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার জানিয়েছেন হিলারি। সত্যের এই নির্লজ্জ অপলাপে ক্ষুব্ধ, ওয়াশিংটনে অবস্থানকারী কোনো আমেরিকান তখন ছদ্মনামে ফেইসবুকে জানিয়ে দেন প্রকৃত টেলিটক কী ছিল।

আর যারা হিলারির ভাষাগত দিকটি সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন, তাদের জানাতে চাই, এই টেলিকথায় হিলারির বক্তব্যের কয়েকটি শব্দ যেমন, অ্যাবসলিউটলি, অনেস্টলি, কনডুইট (conduit), ডিমনাইজ (Demonize), লেট মি কাম টু দি কোর পয়েন্ট (Let me come to the core point), প্রভৃতি মিলে যায় তার আগের অন্যান্য কথাবার্তায়। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনকে তিনি মিস্টার বলেন নি, প্রেসিডেন্ট বলেছেন। কারণ, আমেরিকায় নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রিটায়ার করলেও আমৃত্যু প্রেসিডেন্ট পদবি ব্যবহার করতে পারেন। হিলারি এটা জানেন। হিলারি এটাও জানেন যে, প্রেসিডেন্ট ওবামার মা ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ে থিসিস লিখেছিলেন। কোনো কল্পনাশ্রয়ী টেলি-সংলাপ লেখকের পক্ষে এতটা জানা সম্ভব না-ও হতে পারে।
হাসিনার ভাষা তার একান্ত নিজস্ব, যেটা বোঝা যায় পুনরুক্তিতে। যেমন, আই আন্ডারস্ট্যান্ড আই আন্ডারস্ট্যান্ড, থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ, প্লিজ লিসেন প্লিজ লিসেন ইত্যাদিতে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও ইনডিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক প্রভৃতি ইসুতে সাধারণ মানুষ যা জানত তারই কনফার্মেশন পাওয়া গেছে এই টেলি-কথায়। সুতরাং এটি গ্রহণযোগ্য হতে বাধা কোথায়? নতুন শুধু যেটা জানা গেছে সেটা হলো, গত নির্বাচনটা ছিল সাজানো। এবং ইনডিয়ার এই প্ল্যানে সমর্থন ছিল আমেরিকার।
এই তথ্যেও আশ্চর্য হবার কিছু আছে কি? এটাও সত্য রূপে অনেকে মনে করেন। তারা বলেন, এ জন্যই নভেম্বরে ২০০৮-এ আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে ফিরে ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা নির্বাচনে অংশ নেন। নির্বাচনী অভিযানের জন্য এত অল্প সময় পাওয়ায় তার দুশ্চিন্তা ছিল না। যখন ডিসেম্বর মাসে দুই সপ্তাহে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ১০,০০০ কিলোমিটার পথ চষে দিনে ও রাতে নির্বাচনী অভিযান চালিয়েছেন, তখন শেখ হাসিনা ঢাকায় বসে ভিডিও কনফারেন্স করেছেন। তার কোনো নির্বাচনী অভিযানের প্রয়োজন ছিল না। কারণ তিনি জানতেন, তিনিই বিজয়ী হবেন।
যারা দাবি করছেন, হিলারিলিক সত্য তাদের একটি যুক্তি হচ্ছে, এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আমেরিকার পররাষ্ট্র দফতর কোনো প্রতিবাদ জানায় নি।
হিলারিলিক যদি সত্যি হয়, তাহলে বলতেই হবে, ‘ডিসেম্বর ২০০৮-এর নির্বাচনে গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত হয়নি; চক্রান্ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”
সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কী ছিল?
উত্তরটা দেয়ার আগে, আর্ট বুখওয়াল্ড প্রসঙ্গে আমি ফিরে যাব।
১৭ জানুয়ারি ২০০৭-এ কিডনি ফেইলিওরে ৮১ বছর বয়সে আর্ট বুখওয়াল্ডের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে তিনি তার নিজের একটি ভিডিও অবিচুয়ারি (Obituary) তৈরি করে যান। তার মৃত্যুর পরদিন দি নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের ওয়েবসাইটে এই ভিডিও অবিচুয়ারি প্রকাশ করে। এতে আর্ট বুখওয়াল্ড নিজেই বলেন, Hi, I’m Art Buchwald, I just died. (হাই, আমি আর্ট বুখওয়াল্ড। আমি এই মাত্র মারা গিয়েছি)।
হিলারিলিক প্রকাশিত হবার পরে নির্বাচন কমিশন বলতে পারে, Hi, we’re Election Commission. We just died. (হাই আমরা ইলেকশন কমিশন। আমরা এই মাত্র মারা গিয়েছি)।
কিন্তু আর্ট বুখওয়াল্ডের মতো সততা ও রসবোধ কি নির্বাচন কমিশনের আছে?

১ ফেব্রুয়ারি ২০১১
শফিক রেহমান : লেখক ও প্রবীণ সাংবাদিক।
ফেব্রুয়ারী ১, ২০১১
shafik-rehman111গত ২৮ নভেম্বর ২০১০ থেকে ওয়েবসাইট উইকিলিকস ও তার সহযোগী পাঁচটি আন্তর্জাতিক দৈনিক পত্রিকা ধারাবাহিকভাবে আমেরিকান গোপন কূটনীতিক বার্তা প্রকাশ শুরু করে। বিশ্ব জুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বিশ্ব রাজনীতি নতুন চেহারায় প্রতিভাত হয়। কম্পিউটারের মাধ্যমে বিনিময়কৃত এসব তথ্য ছিল অতি গোপনীয়। উইকিলিকস সেসব ফাঁস করে দেয়ায় বিশেষত আমেরিকান সরকার খুব বিব্রত হয়েছে। এখন চলতিভাবে এসব বার্তা পরিচিত হয়েছে সিক্রেট আমেরিকান ডিপ্লম্যাটিক কেবলস (Cables) নামে। সংক্ষেপে উইকিলিকস নামে। উইকিলিকসের ফাঁস করা এসব তথ্যবহুল আলোচিত হলেও তার সত্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।
কিন্তু ১৬ জানুয়ারি ২০১১-তে প্রকাশিত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ওয়াশিংটন থেকে আমেরিকার সেক্রেটারি অফ স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) হিলারি ক্লিনটনের টেলিফোন আলাপ সত্য কি না তা নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন মহলে জোরালো আলোচনা চলছে। এই টেলি-কথার ট্রান্সক্রিপ্টের ফটোকপি পাওয়া যাচ্ছে এবং এর কিছু অংশ ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ, বাংলা দৈনিক মানবজমিন ও ইংরেজি সাপ্তাহিক হলিডে-তে প্রকাশিত হয়েছে। অন্য পত্রিকাগুলো এই ট্রান্সক্রিপ্ট ছাপেনি।
হিলারি-হাসিনা টেলি-কথার ট্রান্সক্রিপ্ট, যাকে সংক্ষেপে বলা যায় হিলারিলিক, সেটা প্রকাশ না করার কারণ হতে পারে এর সত্যতা সম্পর্কে সংশয়। আওয়ামী লীগ সমর্থকরা হিলারিলিক-কে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। অন্য দিকে, বিএনপি সমর্থকদেরও কেউ কেউ হিলারিলিকের সত্যতা বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করেছেন।
সুতরাং, আসুন বিবেচনা করা যাক হিলারিলিক সত্য কি না।

তার আগে আমি সাম্প্রতিক সময়ের একজন সেরা স্যাটায়ার ও রাজনৈতিক কলাম লেখক, আর্ট বুখওয়াল্ড (Art Buchwald)-এর বিষয়ে কিছু বলে নিতে চাই। নিউ ইয়র্কে বসবাসকারী একটি গরিব অস্ট্রীয়ান-হাংগেরিয়ান ইহুদি পরিবারে ১৯২৫-তে জন্ম হয়েছিল আর্ট বুখওয়াল্ডের। তাকে একটি এতিমখানায় ভর্তি করে দিয়েছিলেন তার পিতা, যিনি ছিলেন দরজি। পরে তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হলেও ১৭ বছর বয়সে তিনি পালিয়ে যান এবং সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হবার পরে তিনি সাংবাদিকতা ও লেখালেখিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। এক পর্যায়ে তিনি আমেরিকা থেকে ইওরোপে চলে যান। সেখানে প্যারিসে ১৯৪৯-তে দি নিউ ইয়র্ক হেরাল্ড ট্রিবিউনের ইওরোপিয়ান সংস্করণের সম্পাদকীয় স্টাফ পদে যোগ দেন। এর পর থেকে তিনি তার রসালো কিন্তু তীক্ষ্ণ, ব্যঙ্গাত্মক কিন্তু মানবতাবোধসম্পন্ন, ঝরঝরে ভাষা কিন্তু বিশ্লেষণমুখী বিভিন্ন ধরনের কলামের জন্য বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ১৯৬২-তে বুখওয়াল্ড ফিরে যান আমেরিকায়। ট্রিবিউন মিডিয়া সিনডিকেট তার লেখা আটলান্টিকের উভয় তীরে একযোগে ৫৫০টি পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করতে থাকে। বুখওয়াল্ডের কলাম একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। রসবোধসম্পন্ন ও রাজনীতিকভাবে উদার, আর্ট বুখওয়াল্ডের কলাম অবশ্য পাঠ্য হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৮২-তে বুখওয়াল্ড পান পুলিৎজার প্রাইজ।
বুখওয়াল্ডের লেখার সঙ্গে আমি পরিচিত হই আশির দশকের শুরুতে। ১৯৭৯-তে লন্ডন থেকে ঢাকায় ফিরে এসে আমি ভালো দৈনিক পত্রিকার তীব্র অভাব অনুভব করছিলাম। তখন বিদেশের খবর জানার জন্য শর্ট ওয়েভে বিবিসি রেডিও-র ওপর নির্ভর করতে হতো। সেই সময়ে ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন পড়া শুরু করি এবং সেখানে বুখওয়াল্ডের কলাম আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। লক্ষ্য করি, তিনিই একমাত্র কলাম লেখক, যিনি বাস্তব ঘটনার সঙ্গে কল্পনার মিশ্রণ ঘটিয়ে বিভিন্ন চরিত্রের সংলাপ লিখতে পারেন। তার সব লেখাই যে এই ধরনের সংলাপনির্ভর ছিল, তা নয়। কিন্তু প্রায়ই তিনি সংলাপ-নির্ভর ব্যঙ্গাত্মক কলাম লিখতেন। বলা হয়, গালিভার্স ট্রাভেলস-এর লেখক জোনাথন সুইফট (১৬৬৭-১৭৪৫)-এর পরে আর্ট বুখওয়াল্ড-ই বিশ্বের সেরা পলিটিকাল স্যাটায়ার লেখক।
এপ্রিল ১৯৮০-তে যখন ঢাকায় সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানীতে আমি যায়যায়দিন নামে একটি রাজনৈতিক কলাম লেখা শুরু করি, তখন মাঝে মাঝে আর্ট বুখওয়াল্ডের সংলাপ-নির্ভর টেকনিক অনুসরণ করি। অক্টোবর ১৯৮৪-তে যায়যায়দিন নামে যখন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করি, তখন মাঝে মাঝে সংলাপ-নির্ভর লেখা দিনের পর দিন কলামে প্রকাশ করতাম। এটি পাঠকের প্রিয় হলেও শাসকের অপ্রিয় হয়। জুলাই ১৯৮৬-তে সাপ্তাহিক যায়যায়দিন নিষিদ্ধ হয়ে যাবার অন্যতম কারণ ছিল দিনের পর দিন কলামে তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর কল্পিত সংলাপ। আমাকে নির্বাসনে যেতে হয়।
কল্পিত রাজনৈতিক সংলাপ লেখা ও প্রকাশ করা যে খুব বিপজ্জনক হতে পারে সেটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় বুঝি। এই ঝুঁকি কীভাবে এড়ানো সম্ভব সেটা জানার জন্য আমি আরো নিয়মিতভাবে আর্ট বুখওয়াল্ডের কলামগুলো পড়ি। আমি সিদ্ধান্তে আসি যে, কল্পিত রাজনৈতিক সংলাপ লিখতে হলে সংশ্লিষ্ট চরিত্রদের সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকতে হবে, কল্পনাশক্তি হতে হবে প্রখর এবং এই ধরনের লেখায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অর্থাৎ, কল্পিত রাজনৈতিক সংলাপ লেখা একটি ডিফিকাল্ট আর্ট।
আর সেজন্যই আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও বাংলাদেশে অনেক ভালো ও শক্তিশালী কলাম লেখক থাকলেও কল্পিত রাজনৈতিক সংলাপ লিখিয়ে ভালো স্যাটায়ারিস্ট নেই।

এই যুক্তিতেই হয়তো বলা যায়, হিলারিলিক কোনো কল্পিত টেলি-কথা নয়। কারণ ইংরেজি ভাষায় এ রকম টেলি-কথা কল্পনাকারী, যাকে অবশ্যই আমেরিকা-বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞ হতে হবে তার কোনো অস্তিত্ব আমরা জানি না। যদি এ রকম কল্পনাশক্তির অধিকারী আমেরিকা-বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞ রাজনৈতিক কলাম লেখক থাকতেন, তাহলে তার লেখালেখির সঙ্গে আমরা ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই পরিচিত থাকতাম। সে রকম কোনো লেখক নেই বলেই ধরা যেতে পারে, হিলারিলিক কল্পিত সংলাপনির্ভর নয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন হিলারিলিককে সত্য বলে মেনে নিতে অনেকে দ্বিধান্বিত হচ্ছেন?

এর উত্তর দিতে হলে বিবেচনা করতে হবে হিলারিলিকের বিষয়বস্তুগুলো কী? পড়ুন তাহলে।
এক. প্রাথমিক সৌজন্য বিনিময়ের পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বলেন, ‘আমেরিকার অ্যামবাসাডর-অ্যাট-লার্জ স্টিফেন র‌্যাপ-কে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে দিল্লির অনুরোধে। ভ্রমণকারী রাষ্ট্রদূত র‌্যাপ ও ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মরিয়ারর্টি-র রিপোর্ট আমি পেয়েছি। যথার্থভাবে মানব অধিকার রক্ষায় আমি এবং প্রেসিডেন্ট ওবামা উভয়েই আগ্রহী। আর সেজন্যই আপনাকে জানাতে চাইছি, যে ফর্ম ও বিষয় নিয়ে বিচার চলছে, সেটাকে আমেরিকা সমর্থন করে না। (বিচারের) পুরো পদ্ধতিটা বাংলাদেশকে এমনভাবে বদলাতে হবে এটা যেন বিরোধীদের শাস্তি দেয়ার বাহক না হয়।’
মন্তব্য : ১৩ জানুয়ারিতে ঢাকায় একটি প্রেস ব্রিফিংয়ে রাষ্ট্রদূত র‌্যাপ যুদ্ধাপরাধের বিচার উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ করার জন্য ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। সুতরাং এটা নতুন কোনো তথ্য নয়। নতুন তথ্যটা হচ্ছে দিল্লির অনুরোধে রাষ্ট্রদূত র‌্যাপকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল।

দুই. হিলারির এই কথার উত্তরে হাসিনা বলেন, ‘আমার আইনমন্ত্রীকে রাষ্ট্রদূত র‌্যাপের বক্তব্য নোট করার জন্য ইতিমধ্যেই বলেছি। আমরা দিল্লির সক্রিয় সমর্থন ও সাহায্যে এই বিচারকাজে হাত দিয়েছি। আমি নিশ্চিত যে, ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইনডিয়ান রাষ্ট্রদূত এ বিষয়ে আপনাকে আরো জানাবেন।”
মন্তব্য : দিল্লির সক্রিয় সমর্থন ও সাহায্যে যে হাসিনা এই বিচারকাজ শুরু করেছেন সেটা অনেকেই মনে করতেন। তবে নতুন জানা গেল, এই নেটওয়ার্কে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইনডিয়ান রাষ্ট্রদূত আছেন।
তিন. এরপর হিলারি বলেন, “আমেরিকার যে মূল্যবোধ ও নীতিমালা আছে সেসব দিল্লির মতো হতে পারে না-ও হতে পারে। আমরা দিল্লির বেশির ভাগ মতামতের প্রতি গুরুত্ব দেই। তবে এই প্রসঙ্গটা (ভিন্ন), তাই আমি ভেবেছি আপনাকে আগেই সেটা বলা উচিত।”
এর উত্তরে হাসিনা বলেন, ‘আপনার উদ্বেগটা বুঝেই বলছি। এসব আমাদের (নির্বাচনী) ম্যানিফেস্টোতে ছিল এবং জনগণ চায় এই বিচারটা যেন চলে।’
মন্তব্য : এটা নতুন কিছু নয়। হাসিনা সব সময়ই বলে এসেছেন জনগণ এই বিচার চায়।
চার. হিলারি তখন বলেন, “অবশ্যই। কিন্তু সেটা এমনভাবে হতে হবে যেন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়। তবে আমাদের মনে হয়, ত্রুটিপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফর্ম বা কায়দায় সেটা হলে, এমনকি যারা আপনার পার্টিকে ভোট দিয়েছেন তাদের কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে না। বিশ্বের যে অঞ্চলে আপনার দেশটি অবস্থিত সেখানে শান্তি আনার জন্য প্রেসিডেন্ট ওবামা খুব পরিশ্রম করছেন। সুতরাং আমেরিকা এমন কোনো কাজ করতে দেবে না, যার ফলে কিছু বৈধ রাজনৈতিক শক্তিকে গোপনে কাজ করতে হতে পারে। কারণ তার ফলে সেটা আপনার জন্য এবং আমাদের জন্যও আরো সমস্যার সৃষ্টি করবে।”
হাসিনা এর উত্তরে বলেন, “এ নিয়ে আপনি দুর্ভাবনা করবেন না। এটাকে তেমন সিরিয়াসলি নেবেন না। আমরা এটা (বিচার) করছি, কারণ এটা আমাদের করতে হবে। এখানে কিছু দোষী মানুষ আছে, যাদের সোজা করতে হবে।”
মন্তব্য : আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি কিছুটা বদলে গেছে। তারা চায় না সন্ত্রাসীদের দমনের অজুহাতে ধর্মভিত্তিক মুসলিম দলগুলোর ওপর কোনো অত্যাচার হোক। আমেরিকা এখন জানে এই ধরনের দমন-পীড়ন নীতির ফলে ধর্মভিত্তিক মুসলিম দলগুলো আত্মগোপন করলে তারা নাশকতামূলক কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য হতে পারে। এবং যেহেতু আন্তর্জাতিক চলাচল এখন সহজ সেহেতু নাশকতার কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বাংলাদেশ থেকে আমেরিকাতেও হাজির হয়ে ধ্বংসাত্মক কাজ করতে পারে। সুতরাং আমেরিকা চায় খোলামেলা রাজনীতিতেই ধর্মভিত্তিক দলগুলো অংশ নিক। লক্ষণীয় যে, হাসিনা তাকে প্রবোধ দেয়ার জন্য বলেছেন বিষয়টা অত সিরিয়াসলি না নিতে। কিন্তু জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করার মাধ্যমেই বোঝা যায়, বিষয়টি হাসিনা সিরিয়াসলিই নিয়েছেন।

পাচ. এরপর হিলারি বলেন, “রাষ্ট্রদূত র‌্যাপ আমাকে আরো জানিয়েছেন, বিচার বিভাগের (জুডিশিয়ারি) ওপর আপনার সরকারের প্রভাবের বিষয়টি তিনি আমাকে বলেছেন, আপনি যেভাবে চান সেভাবেই বিচার বিভাগ রায় দিচ্ছে। এর পরিণতি ভালো হয় না। এ বিষয়ে আপনার সতর্ক হওয়া উচিত।”
হাসিনা তখন বলেন, “ধন্যবাদ। আপনার ও প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের মতামতকে আমি সব সময়ই দাম দেই।”
মন্তব্য : বর্তমান সরকার যে বিচার বিভাগকে সাজিয়েছে সেটা সর্বজনবিদিত। আমেরিকাও সেটা জেনে গেছে। তাই হিলারি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এর পরিণাম অশুভ হয়।

ছয়. এরপর হিলারি বলেন, “যে জন্য আমি আপনাকে ফোন করেছি সেই মোদ্দা কথাটা বলতে চাই। ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতি আপনি যে আচরণ করছেন সে বিষয়ে এমনকি (দৈনিক) ওয়াশিংটন পোস্টও যে লিখেছে সেটা আপনি দেখেছেন। আমি ভাবলাম আপনাকে জানানো উচিত এ জন্য ওয়াশিংটনে আমরা কতটা ক্ষুব্ধ হয়েছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছি, কারণ নোবেল প্রাইজ পাওয়ার অনেক আগেই ক্লিনটন পরিবারের পারিবারিক বন্ধু ছিলেন ড. ইউনূস। আমার মতোই প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনও দুঃখ পেয়েছেন। আশা করি আপনি জানেন, ড. ইউনূস যেন এই পুরস্কারটি পান সেজন্য তিনি কত খেটেছেন। আমি জানি, মানুষের কিছু ব্যক্তিগত ইসু থাকতে পারে। কিন্তু ড. ইউনূসের বিষয়টা জাতীয়। তিনি একজন জাতীয় ব্যক্তিত্ব। আমি মনে করি, দেশের একমাত্র নোবেল লরিয়েটকে শয়তান রূপে চিহ্নিত করা (Demonize) বাংলাদেশের উচিত নয়।’
হিলারির কথা এই পর্যায়ে হাসিনা থামিয়ে দিতে চাইলে হিলারি বলেন, “আগে আমার কথা শেষ করতে দিন। আশা করি, আপনি জানেন প্রেসিডেন্ট ওবামা ক্ষুদ্রঋণ (মাইক্রো ক্রেডিট)-এর একজন বড় গুণগ্রাহী। প্রেসিডেন্ট ওবামার মা যখন মাইক্রো-ফাইনান্সের ওপর থিসিস লেখেন, তখন থেকেই তিনি এর গুণগ্রাহী। তাই আমি আপনাকে এই ফোন কল দিয়ে জানাতে চাইছি, ড. ইউনূসকে শয়তান রূপে চিত্রিত করার (Demonize) আপনার অব্যাহত প্রচেষ্টায় আমি এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ওবামা উভয়েই কতটা ক্ষুব্ধ হয়েছি।”
হাসিনা তখন আত্মরক্ষার জন্য বলেন, “আমরা তো এই ইসুটা তুলি নি। আশা করি আপনি জানেন এই ইসুটা প্রথম তুলেছিল নরওয়ে। তারা অভিযোগ করেছিল ড. ইউনূস ফান্ড অন্যত্র সরিয়ে ফেলেছেন। তা ছাড়া, এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং আমাদের নিয়মনীতি অনুযায়ী এর সুরাহা আমরা করব।”
মন্তব্য : ড. ইউনূসের নোবেল প্রাইজ প্রাপ্তির অনেক আগেই ক্লিনটন পরিবারের সঙ্গে যে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল সেটা সবাই জানেন। বিল ক্লিনটন যে ড. ইউনূসের নোবেল প্রাইজ প্রাপ্তির বিষয়ে কাজ করেছিলেন সেটাও কেউ কেউ অনুমান করেছিলেন। নতুন যেটা জানা গেল সেটা হচ্ছে, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ওবামার মা-ও ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ে থিসিস লিখেছিলেন এবং তখন থেকে ওবামা-ও হয়েছেন ড. ইউনূসের ফ্যান। লক্ষণীয় যে, ড. ইউনূসকে হয়রানির বিষয়ে হাসিনা দায়ী করেছেন নরওয়ের উদ্যোগকে। কিন্তু বলেননি যে, নরওয়ে এ বিষয়ে আগেই তদন্ত করে নির্দোষ জেনে তারপর ড. ইউনূসকে নোবেল প্রাইজ দিয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন নি নরওয়ের টেলিভিশনে একটি ডকুমেন্টারি মুভিতে মূলত ক্ষুদ্রঋণের তাত্ত্বিক দিকটির সমালোচনা করে বলা হয়েছিল যে, এতে গরিবদের উপকার হয় না। ওই ডকুমেন্টারির মূল সমালোচনা ছিল ক্ষুদ্রঋণের উপকারিতা বিষয়ে, ড. ইউনূসের ফান্ড ট্রান্সফার বিষয়ে নয়। কিন্তু এসব তথ্য হাসিনা চেপে গেলেও হিলারি ঠিকই জানতেন।

সাত. তাই এরপর হিলারি বলতে বাধ্য হন, “আমি ভেবেছিলাম আমাকে এত দূর যেতে হবে না। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, আমি ভুল ভেবেছিলাম। আপনি জানেন এবং আমরাও জানি কীভাবে আপনার সরকার ক্ষমতায় এসেছে। ভুলে যাবেন না, নির্বাচনের পর আমরা বলেছিলাম, সেটা অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে এবং আপনাকে সাহায্য করেছিলাম। প্রধানমন্ত্রী, আপনি জানেন দিল্লিতে আমাদের বন্ধুদের নির্দেশে কীভাবে ফলাফল আগেই ঠিক করা হয়েছিল। তারা যেভাবে চেয়েছিল সেভাবেই আমরা চলেছিলাম। প্লিজ, আপনি এটাও ভুলে যাবেন না যে, জেনারেল মইন যিনি আপনাকে ক্ষমতায় এনেছিলেন তিনি এখন আমেরিকাতে আছেন এবং আপনি যতখানি কল্পনা করতে পারেন, তার চেয়েও বেশি এখন আমরা জানি। আমি বলছি না যে, আমরা এখনই আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যাব। আমি শুধু ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন ইসু তুলে ধরছি।”
হিলারির এই কড়া কথায় হাসিনা দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, “আমরা আপনার সমর্থন ও সাহায্য বিষয়ে জানি। আপনাকে খুশি রাখার চেষ্টা করব। দুশ্চিন্তা করবেন না। আপনার কথাগুলো মনে রাখব। এখন বলুন, কবে আমাদের দেশ সফর করতে আসবেন?”
প্রতি উত্তরে হিলারি শুধু বলেন, “আমন্ত্রণের জন্য ধন্যবাদ। আপনি যে সময় দিলেন সেজন্য ধন্যবাদ।”
এরপর হাসিনা বলতে থাকেন, “প্লিজ প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনকে, আপনার মেয়েকে, জামাইকেও সঙ্গে নিয়ে আসবেন।”
ততক্ষণে হিলারি ফোন ছেড়ে দিয়েছেন।
মন্তব্য : জেনারেল মইন ও ইনডিয়ার সাহায্য ও সমর্থনে আওয়ামী লীগ যে গত নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল সেটা তখন অনেকেই বুঝেছিলেন। তবে জানা ছিল না, এর পেছনে আমেরিকার সমর্থন কতখানি। হিলারি-হাসিনার এই টেলিটক থেকে বেরিয়ে আসা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দুটি হচ্ছে :
এক. নির্বাচনের ফল আগেই ঠিক করা ছিল এবং
দুই. তাতে আমেরিকান সমর্থন ছিল।

তাহলে এই ছিল হিলারিলিকের সারাংশ।
যারা বলছেন এটি নির্ভরযোগ্য নয়, তাদের প্রধান দুটি যুক্তি হচ্ছে, এই তথ্যের সোর্স বা সূত্রটির পূর্ণ পরিচয় নেই এবং হিলারির ভাষা আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মানানসই নয়।
প্রথমে বিবেচনা করা যাক সোর্সটি। ফেইসবুকে রবিবার ১৬ জানুয়ারি ২০১১-তে সকাল ১০.২৮ মিনিট বা সাড়ে দশটায়। এটি প্রকাশ করে হিডেন ট্রুথ (Hidden Truth) বা গোপন সত্য। বলা বাহুল্য, এটি প্রকাশকের ছদ্ম নাম। বোধগম্য কারণেই এই প্রকাশক উইকিলিকসের জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের মতো কোনো ঝুঁকি নিতে চান না। তাই ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন।
এটি প্রকাশের তারিখ ও সময়টি বিবেচনা করুন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ শনিবার ১৫ জানুয়ারিতে জানান, সেদিন বাংলাদেশ টাইম সকাল সাড়ে ন’টায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন টেলিফোন করেছিলেন। তখন ওয়াশিংটনে সময় ছিল শুক্রবার ১৪ জানুয়ারি রাত সাড়ে দশটা। এরপর রবিবার ১৬ জানুয়ারি ওয়াশিংটন ডিসি টাইম সকাল সাড়ে দশটায় ফেইসবুকে এই টেলি-কথার ট্রান্সক্রিপ্ট প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ, ওয়াশিংটন থেকে ফোন কল করার ঠিক ৩৬ ঘণ্টা পরে।
ধারণা করা হচ্ছে, এই ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে স্টেট ডিপার্টমেন্ট জেনে যায় হিলারির বক্তব্যকে সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে হাসিনার প্রেস সচিব বর্ণনা করেছেন। রোববার ১৬ জানুয়ারিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিকে এই ফোনালাপের খবর প্রকাশিত হয় এবং তাতে বলা হয় ভূয়সী প্রশংসার পাশাপাশি বিভিন্ন ইসুতে বাংলাদেশ ও আমেরিকা একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার জানিয়েছেন হিলারি। সত্যের এই নির্লজ্জ অপলাপে ক্ষুব্ধ, ওয়াশিংটনে অবস্থানকারী কোনো আমেরিকান তখন ছদ্মনামে ফেইসবুকে জানিয়ে দেন প্রকৃত টেলিটক কী ছিল।

আর যারা হিলারির ভাষাগত দিকটি সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন, তাদের জানাতে চাই, এই টেলিকথায় হিলারির বক্তব্যের কয়েকটি শব্দ যেমন, অ্যাবসলিউটলি, অনেস্টলি, কনডুইট (conduit), ডিমনাইজ (Demonize), লেট মি কাম টু দি কোর পয়েন্ট (Let me come to the core point), প্রভৃতি মিলে যায় তার আগের অন্যান্য কথাবার্তায়। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনকে তিনি মিস্টার বলেন নি, প্রেসিডেন্ট বলেছেন। কারণ, আমেরিকায় নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রিটায়ার করলেও আমৃত্যু প্রেসিডেন্ট পদবি ব্যবহার করতে পারেন। হিলারি এটা জানেন। হিলারি এটাও জানেন যে, প্রেসিডেন্ট ওবামার মা ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ে থিসিস লিখেছিলেন। কোনো কল্পনাশ্রয়ী টেলি-সংলাপ লেখকের পক্ষে এতটা জানা সম্ভব না-ও হতে পারে।
হাসিনার ভাষা তার একান্ত নিজস্ব, যেটা বোঝা যায় পুনরুক্তিতে। যেমন, আই আন্ডারস্ট্যান্ড আই আন্ডারস্ট্যান্ড, থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ, প্লিজ লিসেন প্লিজ লিসেন ইত্যাদিতে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও ইনডিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক প্রভৃতি ইসুতে সাধারণ মানুষ যা জানত তারই কনফার্মেশন পাওয়া গেছে এই টেলি-কথায়। সুতরাং এটি গ্রহণযোগ্য হতে বাধা কোথায়? নতুন শুধু যেটা জানা গেছে সেটা হলো, গত নির্বাচনটা ছিল সাজানো। এবং ইনডিয়ার এই প্ল্যানে সমর্থন ছিল আমেরিকার।
এই তথ্যেও আশ্চর্য হবার কিছু আছে কি? এটাও সত্য রূপে অনেকে মনে করেন। তারা বলেন, এ জন্যই নভেম্বরে ২০০৮-এ আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে ফিরে ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা নির্বাচনে অংশ নেন। নির্বাচনী অভিযানের জন্য এত অল্প সময় পাওয়ায় তার দুশ্চিন্তা ছিল না। যখন ডিসেম্বর মাসে দুই সপ্তাহে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ১০,০০০ কিলোমিটার পথ চষে দিনে ও রাতে নির্বাচনী অভিযান চালিয়েছেন, তখন শেখ হাসিনা ঢাকায় বসে ভিডিও কনফারেন্স করেছেন। তার কোনো নির্বাচনী অভিযানের প্রয়োজন ছিল না। কারণ তিনি জানতেন, তিনিই বিজয়ী হবেন।
যারা দাবি করছেন, হিলারিলিক সত্য তাদের একটি যুক্তি হচ্ছে, এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আমেরিকার পররাষ্ট্র দফতর কোনো প্রতিবাদ জানায় নি।
হিলারিলিক যদি সত্যি হয়, তাহলে বলতেই হবে, ‘ডিসেম্বর ২০০৮-এর নির্বাচনে গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত হয়নি; চক্রান্ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”
সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কী ছিল?
উত্তরটা দেয়ার আগে, আর্ট বুখওয়াল্ড প্রসঙ্গে আমি ফিরে যাব।
১৭ জানুয়ারি ২০০৭-এ কিডনি ফেইলিওরে ৮১ বছর বয়সে আর্ট বুখওয়াল্ডের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে তিনি তার নিজের একটি ভিডিও অবিচুয়ারি (Obituary) তৈরি করে যান। তার মৃত্যুর পরদিন দি নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের ওয়েবসাইটে এই ভিডিও অবিচুয়ারি প্রকাশ করে। এতে আর্ট বুখওয়াল্ড নিজেই বলেন, Hi, I’m Art Buchwald, I just died. (হাই, আমি আর্ট বুখওয়াল্ড। আমি এই মাত্র মারা গিয়েছি)।
হিলারিলিক প্রকাশিত হবার পরে নির্বাচন কমিশন বলতে পারে, Hi, we’re Election Commission. We just died. (হাই আমরা ইলেকশন কমিশন। আমরা এই মাত্র মারা গিয়েছি)।
কিন্তু আর্ট বুখওয়াল্ডের মতো সততা ও রসবোধ কি নির্বাচন কমিশনের আছে?

১ ফেব্রুয়ারি ২০১১
শফিক রেহমান : লেখক ও প্রবীণ সাংবাদিক।

চুমু কাহিনী এবং ওবামার প্রেম



shafik-rehman1111ভালোবাসা দিন যতোই ঘনিয়ে আসে ততোই একটি প্রশ্ন ভালোবাসতে উদগ্রীব মানুষের মনে উঁকি-ঝুকি দিতে থাকে। সেই দিনটিতে আমার প্রিয়জনকে কী গিফট দেবো? এই প্রশ্নটি তাড়া করে বেড়ায় প্রেমিক-প্রেমিকা, স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা-সন্তান, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধবের মনে। যাদের সঙ্গতি আছে এবং চড়া দামে যারা ভীত নন তারা অনেক কিছুই দিতে পারেন। কিন্তু যাদের সঙ্গতি কম তাদের যন্ত্রণা হয় বেশি। তাদের হৃদয়ের আবেগ রুদ্ধ হয়ে যায় টাকার প্রাচীরের সামনে।
আসলে সত্যিকারের ভালোবাসা বিত্তনির্ভর নয়। খুব কম টাকায় অথবা বিনা টাকাতেও ভালোবাসা প্রকাশ করা যায়।
এক টাকায় ভালোবাসা প্রকাশ করা যায় মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে। পাঁচ টাকায় একটা লাল গোলাপের মাধ্যমে। দশ টাকায় একটা ফুলের মালার মাধ্যমে। পনেরো টাকায় একটা গৃটিংস কার্ডের মাধ্যমে।

আর একেবারেই বিনা দামে ভালোবাসা প্রকাশ করা যায় চুমুর মাধ্যমে। প্রেমিক-প্রেমিকা ও স্বামী-স্ত্রী সেদিন আবেগভরা চুমু খেতে পারেন। তারা সেদিন দীর্ঘস্থায়ী চুমু ট্রাই করতে পারেন। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের মতে, ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৯-এ একটানা চুমু খাওয়ার রেকর্ড প্রতিষ্ঠা করেন জার্মানির হ্যামবার্গ শহরে দুই জার্মান নর-নারী। নিকোলা মাটোভিচ ও কৃস্টিনা রাইনহার্ট মোট ৩২ ঘণ্টা ৭ মিনিট ১৪ সেকেন্ড পারস্পরিক ঠোঁটে চুমুবদ্ধ ছিলেন। বিশ্ব রেকর্ড প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুন মেনে তারা সাক্ষীদের সামনে প্রকাশ্যে লক্ষ্য পূরণে এই অ্যাডভেঞ্চারে নেমেছিলেন।
বাংলাদেশে কোনো যুগলের প্রকাশ্যে চুমু বিনিময় অনুচিত হবে। তবে বাংলাদেশে মাঝে মধ্যে সন্তানকে প্রকাশ্যে চুমু দিতে দেখা যায় পিতা-মাতাকে।
চুমু হতে পারে ওই পিতা-মাতাদের চুমুর মতো স্নেহের প্রতীক। চুমু হতে পারে প্রেমিক-প্রেমিকা ও স্বামী-স্ত্রীর ঠোঁটে চুমু খাওয়ার রোমান্স ও আবেগের প্রতীক। আবার বিশিষ্ট ব্যক্তির হাত বা পায়ে চুমু খাওয়া হতে পারে তার প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক।
সাধারণত কামজ চুমু বলতে বোঝায় পারস্পরিক ঠোঁটে চুমু। এটা স্বল্পস্থায়ী হতে পারে, দীর্ঘস্থায়ীও হতে পারে। স্থায়িত্ব যাই হোক না কেন, চুমুর স্বাদ নর-নারীর ক্ষেত্রে অনেক রকমের হতে পারে।

আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামা যখন তরুণ ছিলেন এবং প্রেমে পড়েছিলেন তখন প্রেমিকা মিশেলকে চুমু খাওয়ার স্বাদ বিষয়ে অকপটে লিখেছেন তার আত্মজীবনীমূলক The Audacity of Hope (দি অডাসিটি অফ হোপ, আশার দুঃসাহস) বইটিতে। ওবামা লিখেছেন কীভাবে প্রথম দেখা হয়েছিল মিশেলের সঙ্গে। কীভাবে তাদের প্রেম হয়েছিল এবং মিশেলকে প্রথম চুমু দেয়ার পর তার স্বাদ কেমন মনে হয়েছিল।
এখন পড়ুন তার বইয়ের কিছু অংশ।

আমার স্ত্রীর সঙ্গে যাদের দেখা হয়েছে তাদের বেশির ভাগই মনে করেন, সে অসাধারণ। তাদের এই সিদ্ধান্ত সঠিক। সে স্মার্ট, পরিহাসপ্রিয় এবং আকর্ষণীয়। তাছাড়া তিনি সুন্দরীও বটে। তবে তার এই সৌন্দর্যটা এমন নয় যে, সেটা পুরুষের প্রতি আগ্রাসী অথবা নারীর প্রতি বিতৃষ্ণাদায়ক। রংচংয়ে ম্যাগাজিনের কভারে কিছুটা কৃত্রিমভাবে নারীর যে ভাবমূর্তি দেখা যায় সে রকম সৌন্দর্য তার নয়। তার সৌন্দর্য হচ্ছে একটি প্রাণবন্ত মায়ের সৌন্দর্য এবং পেশাগত কাজে ব্যস্ত একটি ব্যক্তির সৌন্দর্য। কোনো ফাংশনে তার ভাষণ দেয়া বা কথা বলার পর অথবা কোনো প্রজেক্টে তার সঙ্গে কাজ করার পর প্রায়ই কেউ না কেউ আমার কাছে এসে বলেন, বারাক, আপনি তো জানেন আপনাকে কতো বড় মাপের মানুষ মনে করি। কিন্তু … আপনার স্ত্রী … ওয়াও!
আমি তাদের কথায় মাথা নেড়ে সায় দিই। আমি জানি, যদি কোনো পদের জন্য নির্বাচনে তার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয় তাহলে সে অতি সহজেই আমাকে হারিয়ে দেবে।

আমার সৌভাগ্য যে, মিশেল কোনোদিনই রাজনীতিতে যাবে না। এ বিষয়ে কেউ তাকে প্রশ্ন করলে সে উত্তর দেয়, আমার সেই ধৈর্য্যটা নেই।
মিশেল সব সময় সত্য বলে। তার এ কথাটাও সত্য।
মিশেলের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল ১৯৮৮-র গ্রীষ্মকালে। শিকাগোতে অবস্থিত সিডলি অ্যান্ড অস্টিন নামে একটি বড় কর্পরেট ল’ (আইন) ফার্মে তখন আমরা দুজন কাজ করছিলাম। মিশেল বয়সে আমার চেয়ে তিন বছর ছোট হলেও আইনজীবী হিসেবে সিনিয়র ছিল। কলেজ থেকে বেরিয়েই সে হাভার্ড ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে। সেখান থেকে সরাসরি এই ল’ ফার্মে। আর আমি ল’ স্কুলে ফার্স্ট ইয়ার শেষ করে এই ফার্মে কাজ করছিলাম গ্রীষ্মকালীন অ্যাসোসিয়েট রূপে।

আমার জীবনে এই সময়টা ছিল এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে উত্তরণের এবং বেশ কঠিন। কমিউনিটি অর্গানাইজার রূপে তিন বছর কাজ করার পর আমি ল’ স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। যদিও সেখানে আমার পড়াশোনা আমি এনজয় করতাম তবুও আমি ঠিক পথে যাচ্ছি কি না সে বিষয়ে আমার সন্দেহ ছিল। আমি চিন্তিত ছিলাম যে, ল’ স্কুলে ভর্তি হওয়ার এই সিদ্ধান্তটি ছিল আমার যৌবনদীপ্ত আদর্শগুলোকে পরিত্যাগ করা এবং টাকা ও শক্তির রূঢ় বাস্তবতার সঙ্গে একটা আপস করা। পৃথিবীটা যেমন হওয়া উচিত সেদিকে কাজ না করে পৃথিবীটা যেমন সেটা মেনে নিয়ে কাজ করা।
একটা কর্পরেট ল’ ফার্মে কাজ করার চিন্তা আমার সেই আশংকাকে আরো গভীর করেছিল। আমি একটি গরিব এলাকায় থাকতাম। আমার বন্ধুরা সেখানে কঠিন পরিশ্রম করছিল। ল’ ফার্মটির সামাজিক অবস্থান ছিল সেখান থেকে অনেক দূরে। কিন্তু ছাত্র হিসেবে আমি যে ব্যাংক লোন পেয়েছিলাম সেটা দ্রুত বেড়ে যাচ্ছিল। তাই সিডলি অ্যান্ড অস্টিন যখন ভালো বেতনে তিন মাসের একটি চাকরি অফার করলো তখন সেটা নাকচ করার মতো অবস্থা আমার ছিল না। আমি তখন সবচেয়ে শস্তা ভাড়ার একটা ফ্ল্যাটের সাব-টেনান্ট রূপে থাকতাম। ওই চাকরির অফার পেয়ে তিনটা সুট কিনলাম। জীবনে এই প্রথম এক সঙ্গে তিনটা সুট কিনেছিলাম। এক জোড়া নতুন জুতাও কিনেছিলাম। কিন্তু সেই জুতা জোড়ার সাইজ ছিল হাফ-সাইজ কম। তাই পরের নয় সপ্তাহ খুব কষ্ট করে হাটতে হয়েছিল।
জুন মাসের এক সকালে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মধ্যে আমি হাজির হলাম সেই ল’ ফার্মে। আমাকে জানানো হলো, গ্রীষ্মকালীন এই তিন মাসের চাকরিতে আমার এডভাইজর বা উপদেষ্টা রূপে নিয়োগ করা হয়েছে ওই ফার্মের এক তরুণ অ্যাটর্নি-কে। আমাকে তার অফিস কোথায় সেটা দেখিয়ে দেয়া হলো। গিয়ে দেখলাম, সে তরুণী!
মিশেল-এর সঙ্গে প্রথম দেখায় আমার যেসব কথা হয়েছিল আজ তা মনে নেই। শুধু মনে পড়ে, সে ছিল লম্বা। হাই হিল জুতা পরে প্রায় আমার সমান। আর সে ছিল লাভলি। তার ফ্রেন্ডলি কিন্তু প্রফেশনাল আচার-ব্যবহার মানানসই ছিল তার পোশাকের সঙ্গে। সে পরেছিল সুট আর ব্লাউজ।
আমাকে সে বুঝিয়ে বললো, ফার্মে বিভিন্ন ব্যক্তিকে কীভাবে বিভিন্ন কাজ বিলি করা হয়। যারা গ্রুপ হয়ে প্র্যাকটিস করেন তাদের ধরন কী রকম এবং কাজ করার পর ঘণ্টা মেপে কীভাবে ক্লায়েন্টদের বিল করতে হয়। আমি কোথায় বসবো সেটা সে দেখিয়ে দেয়। তারপর আমাকে সে ফার্মের লাইব্রেরি দেখাতে নিয়ে যায়। এরপর সে ফার্মের একজন পার্টনারের কাছে আমাকে রেখে যায়। যাওয়ার আগে সে বলে যায়, লাঞ্চে আমার সঙ্গে দেখা করবে।
বহু দিন পরে আমাকে মিশেল বলেছিল, যখন আমি তার অফিসে ঢুকেছিলাম তখন সে বেশ অবাক হয়েছিল। চাকরিতে জয়েন করার জন্য অ্যাপ্লিকেশন লেটারের সঙ্গে যে পাসপোর্ট সাইজ ছবি সংযুক্ত করেছিলাম তাতে আমার নাকটা একটু বড় দেখাচ্ছিল। ইন্টারভিউতে যেসব সেক্রেটারি আমাকে দেখেছিল তারা মিশেলকে বলেছিল, আমি সুদর্শন – কিউট! কিন্তু ওই পাসপোর্ট ছবি দেখায় মিশেল তাদের কথা বিশ্বাস করতে চায় নি। মিশেল পরে বলেছিল, একটা কালো লোক যে সুট-টাই পরে চাকরির জন্যে এই ফার্মে এসেছে তাতেই তারা ইমপ্রেসড হয়েছিল। মিশেল হয়তো এখন বলবে, আমার নাকটা সাধারণের তুলনায় বেশ বড়।
আমাকে সামনাসামনি দেখার পরে মিশেল ইমপ্রেসড হয়েছিল কি না সেটা লাঞ্চে আমাকে বুঝতে দেয় নি। খাবার সময়ে আমাকে সে বললো, সে বড় হয়েছে নিউ ইয়র্কের দক্ষিণ অঞ্চলে একটি ছোট বাংলোতে। ওই এলাকার খুব কাছেই আমি অর্গানাইজার হিসেবে কাজ করেছিলাম। তাই এলাকাটি যে বর্ধিষ্ণু সেটা আমি জানতাম। নিউ ইয়র্ক সিটি-র পাম্প অপারেটর পদে কাজ করছেন তার বাবা। ছেলেমেয়েরা বড় না হওয়া পর্যন্ত হাউসওয়াইফ ছিলেন তার মা। এখন তিনি একটি ব্যাংকে ক্লার্ক পদে আছেন।

মিশেল প্রথমে পড়াশোনা করেছিল বৃন মর পাবলিক এলিমেন্টারি স্কুলে এবং তারপর হুইটনি ইয়াং ম্যাগনেট স্কুলে। তার বড়ভাই পৃন্সটন ইউনির্ভাসিটিতে পড়াশোনা করেছিল। স্কুল জীবন শেষের পরে ভাইয়ের পদাংক অনুসরণ করে মিশেলও পৃন্সটনে যায়। সে ওই ইউনিভার্সিটির বাস্কেটবল টিমের একজন স্টার প্লেয়ার হয়। সিডলি অ্যান্ড অস্টিন ফার্মে সে ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি গ্রুপে কাজ করছিল। বই, সিডি, ডিভিডি, গান ইত্যাদিকে ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি বা সম্পত্তি বলা হয় এবং এসব বিষয়ে মামলা দেখাশোনার কাজ সে করতো। বিশেষত সে এন্টারটেইনমেন্ট ল’ বা বিনোদন বিষয়ক আইনে স্পেশালাইজ করেছিল। যেহেতু লস অ্যাঞ্জেলেস ও নিউ ইয়র্ক – এই দুটি শহর হচ্ছে বিনোদনের দুটি বড় কেন্দ্র সেহেতু ওই দুই শহরের কোনো একটিতে গিয়ে এবং স্থায়ীভাবে থেকে তার ক্যারিয়ার সামনের দিকে নেয়ার কথা ভাবছিল মিশেল।
ওহ! মিশেল সেদিন তার গাদা গাদা প্ল্যানের কথা বলেই চলেছিল। সে বলেছিল, সে এমন একটা ফাস্ট ট্র্যাকে আছে যেখানে মনোযোগ নষ্টকারী কোনো কিছুর জন্য, বিশেষত পুরুষ মানুষের জন্য, দাড়ানোর কোনো সময় তার নেই। তবে সে জানতো কতো উজ্জ্বলভাবে এবং সহজে হাসতে হয়। এক পর্যায়ে আমি লক্ষ্য করলাম, তার অফিসে ফিরে যাওয়ার তেমন কোনো তাড়া নেই।
তাছাড়া আরো একটা কিছু ছিল। যখনি আমি তার দিকে তাকাচ্ছিলাম তখনি তার গভীর দুটি কালো চোখে একটা ঝিলিক দেখা যাচ্ছিল। তাতে মনে হচ্ছিল, সে তার হৃদয়ের গভীরে একটা অনিশ্চয়তা বোধ করছে। সে হয়তো বুঝতে পারছিল, সব কিছুই কতো ভঙ্গুর। এক মুহূর্ত অসাবধান হলেই তার সব প্ল্যান ভেস্তে যাবে।
সে যে দুর্বলতায় ভুগতে পারে সেটা আমাকে স্পর্শ করলো। তার জীবনের সেই অংশটা আমি বুঝতে চাইলাম।

এর পরের কয়েক সপ্তাহে প্রতিদিনই আমরা দেখা করতাম। কখনো ল’ লাইব্রেরিতে, কখনো কাফেটেরিয়াতে, কখনো বা অফিসের বাইরের সব অনুষ্ঠানে। এসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করতো ল’ ফার্মগুলোই। আমার মতো যারা গ্রীষ্মকালে কাজ করতে আসতো, যাদের বলা হতো সামার অ্যাসোসিয়েটস, এসব অনুষ্ঠানে তাদের বোঝানো হতো আইন পেশায় ঢুকলে সারাটা সময় শুধু দলিলপত্রই দেখতে হবে না, তার বাইরেও অন্য জীবন আছে।
মিশেল এই ধরনের দুই-একটি পার্টিতে আমার সঙ্গে গিয়েছিল। এসব পার্টিতে যাওয়ার জন্য আমার যে ভালো পোশাক নেই সেটা সে বুঝতে চায় নি। সে তার কিছু বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু প্রপার ডেট (Proper Date) সে কখনো করতে চায় নি। সে বলতো, যেহেতু ফার্মে সে আমার এডভাইজার সেহেতু ডেট করা অনুচিত হবে।
একদিন তাকে বললাম, এটা একটা খোঁড়া অজুহাত। কাম অন, তুমি আমাকে কী উপদেশ দিচ্ছ? তুমি দেখাচ্ছ কীভাবে ফটোকপিইং মেশিন কাজ করছে। তুমি বলছ, কোন সব রেস্টুরেন্টে যেতে হবে। আমার তো মনে হয় না, তুমি যদি আমার সঙ্গে একটা ডেট করো, সেটাকে ফার্মের কোনো পার্টনার কাজের নিয়ম-কানুন ভঙ্গকারী রূপে সিরিয়াসলি ভাববে।
মিশেল মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, সরি।
ওকে। তাহলে আমি সরে দাঁড়াবো। তুমি তো আমার এডভাইজর। এখন এডভাইস দাও, কার কাছে আমি যাবো?
আমি হাল ছেড়ে দিলাম না। শেষ পর্যন্ত তাকে কাবু করলাম।
সেদিন ছিল ফার্মের পিকনিক। পিকনিকের পর সে তার গাড়ি চালিয়ে আমার ফ্ল্যাটে আমাকে পৌঁছে দিল। তাকে বললাম, রাস্তার ওপারে বাসকিন-রবিনস আইসক্রিম শপ আছে। আইসক্রিম কোন খাবে?
সে রাজি হলো।
আমরা বিকেলের চিটচিটে গরমে ফুটপাথে বসে আইসক্রিম কোন খেলাম। তাকে জানালাম যখন আমি টিনএজার ছিলাম তখন বাসকিন-রবিনসে কাজ করেছিলাম। বাসকিন-রবিনসের ব্রাউন এপ্রন আর ক্যাপ পরে আইসক্রিম বিক্রেতার পোশাকে মেয়েদের কাছে আকর্ষণীয় হওয়াটা ছিল কঠিন কাজ।
মিশেল বললো, আমি যখন ছোট ছিলাম তখন পিনাট বাটার (Peanut butter – চিনাবাদাম মাখন) ও জেলি ছাড়া বছর দুই তিনেক কিছুই খেতে চাইতাম না।
তোমার ফ্যামিলির সঙ্গে একদিন দেখা করতে চাই। বললাম।
হ্যাঁ। এটা ভালো কথা। মিশেল বললো।
এরপর আমি তাকে চুমু খাওয়ার অনুমতি চাইলাম।
সেই চুমুর স্বাদ ছিল চকোলেটের মতো।

সেই গ্রীষ্মের বাদবাকি সময়টা আমরা এক সঙ্গে কাটাই। তাকে বলি আমার অর্গানাইজ করার কথা, ইন্দোনেশিয়াতে থাকার কথা। সমুদ্রে সার্ফ করলে কেমন লাগে সে কথা।
সে তার ছোটবেলার বন্ধুদের কথা বললো। হাই স্কুলে থাকার সময়ে একবার প্যারিসে যাওয়ার কথা বললো। আর বললো, তার ফেভারিট গায়ক স্টিভি ওয়ান্ডার-এর গানের কথা।
মিশেলকে আমি পূর্ণভাবে বুঝতে শুরু করি তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করার পর। লিভ ইট টু বিভার (Leave It to Beaver) ) পারিবারিক টিভি সিরিজের বিভিন্ন চরিত্রের মতো রবিনসন পরিবারেও সমন্বয় ঘটেছিল অনেকের। সেখানে ছিলেন নরম মনের রসিক বাবা ফ্রেজিয়ার যিনি প্রতিদিনই কাজে যেতেন এবং তার ছেলের বাস্কেটবল খেলা মিস করতেন না। সেখানে ছিলেন সুদর্শনা ও সুবুদ্ধিমতী মা মেরিয়ান যিনি বার্থডে কেক বানাতেন, বাড়িতে শৃঙ্খলা রাখতেন এবং স্কুলে মিয়মিত গিয়ে জানতে চাইতেন তার ছেলেমেয়েরা কেমন করছে এবং তাদের সাহায্যের জন্য টিচাররা কী করছেন। সেখানে ছিল লম্বা, ফ্রেন্ডলি, ভদ্র ও পরিহাসমুখর বাস্কেকটবল স্টার ভাই ক্রেইগ। সে কাজ করছিল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার রূপে। কিন্তু স্বপ্ন দেখছিল বাস্কেটবল টিমের কোচ হওয়ার। সেখানে ছিল অনেক আংকল আর আন্টি, মামাতো-খালাতো-চাচাতো-ফুপাতো ভাইবোনের দঙ্গল।। তারা এসে কিচেন টেবিলের চারপাশে বসে যেতো, মজার সব গল্প বলতো। দাদুর জ্যাজ রেকর্ড বাজিয়ে শুনতো। গভীর রাত পর্যন্ত হাসি আর আড্ডায় মাতোয়ারা থাকতো।

রবিনসন পরিবারে শুধু একটি চরিত্রই মিসিং ছিল। তাদের কোনো কুকুর ছিল না। তার বাড়ির জিনিসপত্র ওলোট-পালট হয়ে যাবে এই ভয়ে কোনো কুকুর কখনোই চান নি মেরিয়ান।
তার পরিবারে এই যে শান্তি ও সুখ বিরাজ করছিল সেটা আরো বিস্ময়কর ছিল এই জন্য যে, তাদের অনেক ধরণের সামাজিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে হয়েছিল। তারা ছিল কালো। তাই তাদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল বর্ণবাদীদের বিরুদ্ধে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে শিকাগোতে মিশেলের পিতা-মাতা যখন জীবন সংগ্রাম শুরু করেছিলেন তখন সেখানে কর্মসংস্থান ছিল কম। কালোদের বিরুদ্ধে তখন এমন প্রচারণা চালানো হয়েছিল যে, এলাকা থেকে ভয়ে অনেক শাদা পরিবার অন্যত্র চলে গিয়েছিল। কালো পরিবারকে বেশি কাজ করতে হতো। পথে ছিনতাইকারী ও মাস্তানদের ভয় ছিল। স্কুলে খেলাধুলার ব্যবস্থা ছিল কম। রবিনসন পরিবারের একটা ট্র্যাজেডি ছিল, মিশেলের বাবা ত্রিশ বছর বয়স থেকে মালটিপল স্ক্লেরোসিস (Multiple Sclerosis) রোগে ভুগছিলেন। পরবর্তী পঁচিশ বছরে তার অবস্থা আরো খারাপ হয়েছিল। কিন্তু তিনি দমে যান নি। পরিবারের প্রতি সব দায়িত্ব তিনি হাসিমুখে পালন করে যান। ঠিক সময়ে নিজের কাজে যাওয়ার জন্য সকালে ঘুম থেকে এক ঘণ্টা আগে উঠতেন। কষ্ট করে হলেও গাড়ি চালাতেন। নিজের শার্টের বোতাম নিজেই লাগাতেন। এসব করতে কষ্ট হলেও তিনি তা নিয়ে হাসিঠাট্টা করতেন। প্রথমে খুড়িয়ে খুড়িয়ে এসব করতেন। পরে দুটো লাঠি নিয়ে চলতেন। তার মাথায় টাক পড়েছিল। একটু পরিশ্রমে তার টেকো মাথা ঘেমে উঠতো। তবু তিনি এঘর থেকে ওঘরে যেতেন ছেলের খেলা দেখতে অথবা মেয়েকে চুমু দিতে।
বিয়ের পরে মিশেল আমাকে বুঝিয়েছিল, তার বাবার সুদীর্ঘ অসুস্থতা তাদের পরিবারের ওপর কতো চাপ সৃষ্টি করেছিল। মিশেলের মা সেটা কীভাবে সামলে ছিলেন। সব কিছু ঠিকঠাক রেখে পরিবার চালাতে গিয়ে মা-কে কতো হিসাব-নিকাশ করতে হতো। বাইরে তাদের সবার মুখে হাসি থাকলেও ভেতরে ছিল এই কষ্ট আর সমস্যা।
কিন্তু রবিনসনদের বাড়িতে আমি প্রথম যেদিন গিয়েছিলাম তখন শুধুই আনন্দ দেখেছিলাম। মিশেলের বাবাকে চিনতাম না। জানতাম না, জীবিকার তাগিদে তাকে এক সময়ে শহর থেকে শহরে ঘুরে বেড়াতে হয়েছিল। ফ্রেজিয়ার আর মেরিয়ান তাদের নিজেদের এবং ছেলেমেয়েদের জন্য যে বাড়ি গড়ে তুলেছিলেন তার পেছনে ছিল অনেক শ্রম ও ত্যাগ। ওই পরিবারের সবাই কাঙাল ছিল স্থিতিশীলতার প্রতি, একটা স্থায়ী ঠিকানার প্রতি।
সেই পরিবারে আমার হঠাৎ উদয়কে মিশেল দেখেছিল অ্যাডভেঞ্চার, ঝুঁকি এবং দূর-দূরান্তে দেশ ভ্রমণের একটা সম্ভাবনা রূপে। এর আগে মিশেল তার দিগন্ত প্রসারের কথা ভাবে নি।
মিশেলের সঙ্গে দেখা হওয়ার ছয় মাস পরে তার বাবা হঠাৎ মারা যান। কিডনি অপারেশনের পর সৃষ্ট বিভিন্ন জটিলতা ছিল তার মৃত্যুর কারণ। আমি প্লেনে শিকাগো থেকে তার কবরস্থানে যাই। কবরের পাশে যখন দাঁড়াই তখন মিশেল তার মাথা আমার কাধে হেলিয়ে দেয়। কফিনটা যখন কবরে নামানো হচ্ছিল তখন আমি ফ্রেজিয়ার রবিনসনের প্রতি অঙ্গীকার করি যে তার মেয়েকে আমি দেখাশোনা করবো। আমি বুঝতে পারি, অনুচ্চারিত হলেও মিশেল আর আমি একটি পরিবার গঠন করতে চলেছি।

বারাক ওবামা লিখেছেন, মিশেলকে চুমু দেয়ার স্বাদ মনে হয়েছিল চকোলেটের মতো। বাংলাদেশে অনেকে লজেন্সকে বলেন চকোলেট। লজেন্সের প্রধান উপাদান চিনি, রঙ ও বিভিন্ন ফলের (কমলা, লেবু, স্ট্রবেরি, কলা) রস। লজেন্স হতে পারে বিভিন্ন রঙের। কিন্তু চকোলেটের প্রধান উপাদান কোকো, দুধ ও চিনি। গরমে চকোলেট তাড়াতাড়ি গলে যায়। তাই বাংলাদেশে চকোলেট কেনা-বেচা হয় কম। লজেন্সকেই চকোলেট ভেবে তৃপ্তি পান অনেকে।
বিশ্বের সেরা চকোলেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে নেসলে, ক্যাডবেরি, হার্শি, লিন্ডট, গডাইভা, থর্নটন, ফেরেরো রশার প্রভৃতি।
আমেরিকান কম্পানি হার্শি-র একটি পপুলার ব্র্যান্ড চকোলেটের নাম Kisses (কিসেস বা চুমু)। পশ্চিমে ভ্যালেনটাইনস ডে-তে প্রেমিক-প্রেমিকা ও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অবশ্যই চকোলেট দেয়া-নেয়া ও খাওয়া হয়।

ইওরোপে চকোলেট ম্যানিয়া শুরু হয়েছিল সপ্তদশ শতাব্দীতে প্যারিসে। ফরাশিরা মনে করেছিল, চকোলেট কামভাব উদ্দীপক বা এক ধরনের অ্যাফ্রোডিজিয়াক (Aphrodisiac)। তাদের আর্ট ও সাহিত্যে প্রেমের পাশাপাশি চকোলেটের উপস্থিতি গোটা ইওরোপকে অনুপ্রাণিত করে। বিখ্যাত প্রেমিক ক্যাসানোভা শ্যামপেইনের সঙ্গে চকোলেট মিশিয়ে নারীদের শয্যাসঙ্গিনী করতেন।
এবার বাংলাদেশে ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে যুগলরা চকোলেট বিনিময় করতে পারেন। ঢাকা ও চট্টগ্রামে ফেরেরো রশার চকোলেট পাওয়া যায়। কিন্তু এর দাম খুব বেশি। আশা করা যায়, ইমপোর্টাররা শিগগিরই বাংলাদেশে অল্প দামের চকোলেট আমদানিতে আগ্রহী হবেন। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে যুগলরা ইগলু অথবা পোলার কোম্পানির চক আইস খেয়ে ভালোবাসা দিবস উদযাপন করতে পারেন।
বলা বাহুল্য, চকোলেট খাওয়ার পর যদি চুমু খাওয়া হয় তাহলে তার স্বাদ চকোলেটের মতোই লাগবে। ওবামা লেখেন নি বাসকিন-রবিনসের ওই দোকান থেকে তারা চক আইস কোন খেয়েছিলেন কি না।

ভালোবাসা দিনে চকোলেট বা চক আইস না পেলেও যুগলরা চুমু খেতে পারেন। ২০০৯-এ আমেরিকান বিজ্ঞানীরা জানান, চুমু খেলে মানুষের বিভিন্ন ইন্দ্রিয় সতেজ হয়ে ওঠে। বিশেষত স্পর্শ। স্বাদ ও গন্ধ যুগলের মধ্যে এনে দেয়া উত্তেজনা। চুমুর মাধ্যমে নর-নারী চায় পরস্পরকে ভদ্রভাবে স্পর্শ ও আদর করতে। পরস্পরের মুখের সুস্বাদ গ্রহণ করতে এবং পরস্পরের সুঘ্রাণ নিতে।
যারা পান, সিগারেট ও মদ খেয়ে দেবদাস হয়ে চুমু খেতে যান তারা তাদের পার্বতীদের কাছে গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারেন। পশ্চিমে কিছু যুগল ডেট করার আগে Listerine (লিস্টেরিন) অথবা Oral-B (ওরাল-বি) মাউথ রিনস পানিতে মিশিয়ে মুখ ওয়াশ করে যান। লিস্টেরিন দুই ধরণের হতে পারে। এক. অরিজিনাল ব্র্যান্ড এবং দুই. ভ্যানিলা-মিন্ট ব্র্যান্ড। লিস্টেরিন এবং ওরাল-বি ঢাকা ও চট্টগ্রামের ভালো ফার্মাসিতে পাওয়া যায়। যাদের এই মাউথ ওয়াশ কেনার সামর্থ নেই তারা ভালো এবং সম্ভব হলে মিন্ট ফ্লেভারযুক্ত টুথপেস্টের শরণাপন্ন হতে পারেন এবং ভালোভাবে দাত ব্রাশ করে ডেট করতে পারেন। লিস্টেরিন এবং ওরাল-বি মাউথ ওয়াশের দাম পাঁচশ মিলিগ্রামের বোতল অনূর্ধ্ব পাঁচশ টাকা। সাধারণ দাঁত ও মাড়ির সুস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য মাউথ ওয়াশ ব্যবহৃত হয়।
মৌরি, এলাচি, লং অথবা দারুচিনি খেয়েও ডেট করতে পারেন। তবে সাবধান থাকতে হবে, এসব মশলার কোনো গুড়া অংশ যেন মুখে না থেকে যায়।
২০০৯-এর ভ্যালেনটাইনস ডে-তে একদল আমেরিকান সায়েন্টিস্ট একটি রিপোর্টে জানান, চুমুতে পারস্পরিক যোগ্যতা বোঝা যায়। সুতরাং চুমুকে সিরিয়াসলি নেয়া উচিত। শিকাগোতে একটি প্রেস কনফারেন্সে তারা বলেন, পুরুষ মানুষের স্যালাইভা বা লালা-তে বোঝা যায় তার জন্মদান ক্ষমতা এবং বংশবৃদ্ধির যোগ্যতা।
নিউ জার্সি-র রাটগার্স ইউনিভার্সিটির এনথ্রোপলজিস্ট ড. হেলেন ফিশার বলেন, চুমু দেয়াটা হচ্ছে মানব জাতির একটি শক্তিশালী মেকানিজম। সে জন্যই সারা বিশ্বে চুমু প্রচলিত আছে যুগ যুগ ধরে। মানব সমাজের নব্বই পার্সেন্টের বেশি চুমু খায়।

শিকাগোতে অনুষ্ঠিত আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্স (AAAS)-এর বার্ষিক সম্মেলনে বিজ্ঞানীরা বলেন, শিম্পাঞ্জি আর বোনোবো-রাও চুমু খায়। শিয়ালরা পরস্পরের মুখ লেহন করে। পাখিরা তাদের ঠোটে চুমু খায়। হাতিরা তাদের শুঁড় পরস্পরের মুখে গুজে দেয়। মানুষ চুমু খাওয়ার সময়ে পরস্পরকে ছোঁয়, দেখে, অনুভব করে। অপরজনের স্বাদ পায়। ব্রেইনের একটা বড় অংশ উদ্দীপিত হয়ে ওঠে।
সম্মেলনে ওই বিজ্ঞানীরা বলেন, সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা থেকে শুরু হয়েছে চুমু। এখন পশ্চিমে সুপারমার্কেটে হাইনজ (Heinz)সহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বেবিফুড ছোট কৌটায় বা ছোট বোয়মে পাওয়া যায়। শিশুরা এসব বেবিফুড খেয়ে বড় হয়। অতীতে শিশুদের উপযোগী করার জন্য মা খাবার চিবিয়ে সেটি চুমুর মাধ্যমে সরাসরি শিশুর মুখে পুরে দিতেন। বলা যায়, তখন থেকে প্রিয়জনের মুখে মুখ লাগিয়ে মানুষ চুমু খাওয়া শুরু করে।
চুমুর এই ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা কিছু বিজ্ঞানী নাকচ করে দেন। ড. হেলেন ফিশার বলেন, পারস্পরিক সম্পর্কের সূচনায় চুমু হয় একটা নতুন অভিজ্ঞতা। আর এই নতুনত্বটা মানবদেহে সৃষ্টি করে ডোপামিন (Dopamine) যেটা রোমান্টিক প্রেমের সঙ্গে জড়িত। চুমুর ফলে মানুষের মধ্যে জুটিবদ্ধ হওয়ার এবং কাছাকাছি থাকার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। আর জুটিবদ্ধ বা পেয়ার বনডিং (Pair bonding) হওয়ার ফলে সন্তান হয়।

চুমু এবং জুটিবদ্ধ হওয়ার ফলে মানবদেহে যেসব প্রতিক্রিয়া হয় তা বোঝার জন্য লাফায়েত কলেজের নিউরোসায়েন্টিস্ট ড. ওয়েনডি হিল পনেরো জোড়া তরুণ প্রেমিক-প্রেমিকার সহযোগিতা নেন। তিনি তাদের দুটি গ্রুপে ভাগ করে দেন। একটি গ্রুপের জন্য তিনি সুরেলা মিউজিক সিডি প্লেয়ারে অন করে দিয়ে তাদের পনেরো মিনিট চুমু খেতে বলেন। অন্য আরেকটি রুমে অন্য গ্রুপকে শুধু হাত ধরাধরি করে গল্প চালিয়ে যেতে বলেন।
এরপর ড. হিল মেপে দেখেন তাদের লালা-তে স্ট্রেস হরমোন কর্টিজল (Cortisol)-এর কী পরিবর্তন ঘটেছে। দেখা যায়, চুমু গ্রুপের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে স্ট্রেস বা মানসিক চাপ কমে গেছে। যতো বেশি তারা চুমু খেয়েছে ততো বেশি তাদের কর্টিজল-এর পরিমাণ কমে গেছে। একই সময়ে ড. হিল তাদের ব্লাড টেস্ট করে রক্তে অক্সিটোসিন (Oxytocin)-এর পরিমাপ করেন। অক্সিটোসিন হচ্ছে এক ধরণের হরমোন যা মানুষকে যৌনমিলনে আগ্রহী করে তোলে। তাই এই হরমোনকে লাভ হরমোন (Love Hormone) বা ভালোবাসার হরমোনও বলা হয়।
শিকাগোর সম্মেলনে সায়েন্টিস্টদের এসব জ্ঞানগর্ভ তথ্যে কেউ কেউ কৌতুক বোধ করেন। তারা বলেন, একটি যুবক আর একটি যুবতীকে কোনো ঘরে রেখে তাদের জড়াজড়ি করার সুযোগ দিলে যা ঘটার তাই ঘটবে। বলিউড মুভি ববি-র গানটা হয়তো মনে পড়বে, হাম তুম, এক কামরে-মে বন্ধ হ্যায়, অউর চাবি খো গ্যায়ে! অথবা হয়তো মনে পড়বে আরেক হিন্দি মুভিতে নায়ক বলরাজ সাহনি-র উক্তি, আগুনের পাশে মোম রাখলে সে তো গলে যাবেই!
আমেরিকায় যখন এসব কিসিং সায়েন্টিস্টদের সম্মেলন হচ্ছিল, প্রায় সেই একই সময়ে প্রতিবেশী দেশ মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে আরেক ধরণের সম্মেলন ঘটছিল। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৯-এ মেক্সিকো সিটির ছোকালো (Zocalo) স্কোয়ারে মিলিত হওয়া ৩৯,৮৯৭ নর-নারী গণচুমুর নতুন রেকর্ড স্থাপন করেন। এর আগে ইংল্যান্ডে ওয়েস্টন সুপারমেয়ার শহরে গণচুমুতে অংশ নিয়েছিলেন ৩২,৬৪৮ নর-নারী।
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড বুকে যেসব দেশের অধিবাসী নাম লেখাতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী তাদের মধ্যে মেক্সিকো ফার্স্ট। মেক্সিকানদের অনুরোধে ছোকালো স্কোয়ারে গিনেস রেকর্ডস কর্তৃপক্ষ পাঠিয়েছিলেন প্রতিনিধি পর্যবেক্ষক কার্লোস মার্তিনেসকে। তিনি রিপোর্ট করেন, ছোকালো স্কোয়ারে ৪২,২২৫ জন জড়ো হলেও সবাই শেষ পর্যন্ত চুমুতে অংশ নেন নি। অর্থাৎ ২,৩২৮ নর-নারী বা ফাইভ পার্সেন্টের কিছু বেশি যে কোনো কারণেই হোক না কেন প্রকাশ্যে চুমু খেতে রাজি হন নি।
বাংলাদেশে টিএসসি চত্বরে, জিয়া উদ্যানে, ফয়ে’স লেকে অথবা চিড়িয়াখানাতে কিছু সাহসী প্রেমিক-প্রেমিকাকে বাদ দিলে বলা যায় প্রায় হান্ড্রেড পার্সেন্ট নরনারী প্রকাশ্যে চুমু খেতে গররাজি হবেন।

পশ্চিমে গণচুমু দেখা যায় প্রতিদিনই রেল স্টেশন, এয়ারপোর্ট ও সিপোর্ট-এর টারমিনালে। এসব জায়গায় প্রিয়জনকে বিদায় জানাতে নর-নারী দীর্ঘ সময় জুড়ে চুমু খান। এ রকম গণচুমুকে নিরুৎসাহিত করার জন্য কিছুকাল আগে বৃটিশ রেল কর্তৃপক্ষ রেল স্টেশনে একটি বিলবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছিল। ধুমপান নিষিদ্ধ স্টাইলে আঁকা এই বিলবোর্ডে চুমুরত নর-নারীর চারপাশে একটি লাল বৃত্ত এঁকে তার মধ্যে আড়াআড়ি দাগ দেয়া হয়েছিল। এর কারণ স্বরূপ রেল কর্তৃপক্ষ জানায়, ট্রেন ছাড়ার আগ মুহূর্তে সবাই স্টেশনের গেইটে গাড়ি পার্ক করে চুমু খেয়ে বিদায় জানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে কার পার্কিং এলাকায় বিশৃংখলা ও জ্যাম হয়।
চুমু খাওয়ার সময়ে সাধারণত মেয়েরা চোখ বন্ধ করে ফেলে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে কোনো বিজ্ঞানী এখনো এগিয়ে আসেন নি। তবে নারীবাদীরা বলেন, ছেলেরাও চুমু খাওয়ার সময়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে, হয়তো বা মেয়েটির কিছু পরে। গভীর আবেশে ডুবে যাওয়ার ফলে এমনটা ঘটে। আমেরিকান হিউমারিস্ট এভান এসার বলেন, মেয়েদের প্রেম গভীরতর। তাই চুমু খাওয়ার সময়ে মেয়েরা ভুলে যায় স্থান-কাল-পাত্র। সে চোখ বন্ধ করে পাত্র বা প্রেমিকের নামটি মনে করার চেষ্টা করে!

চিলির প্রয়াত প্রেসিডেন্ট সালভাডর আলেন্দে-র পলিটিশিয়ান কন্যা ইসাবেল আইয়েন্দের উক্তিতে এই তত্ত্বের সমর্থন পাওয়া যায়। ইসাবেল আইয়েন্দে বলেন, আমি প্রথম চুমুর সময়ে যে চুইয়িং গাম, সিগারেট আর মদের গন্ধ পেয়েছিলাম সেটা আজও মনে আছে। কিন্তু যে আমেরিকান নাবিকটি সেই চুমু আমাকে দিয়েছিল তার চেহারা একেবারেই ভুলে গিয়েছি!
জীবনের বিভিন্ন প্রথম অভিজ্ঞতার বিভিন্ন দিকটি মানুষ মনে রাখে। ইটালির প্রখ্যাত মিউজিক কন্ডাক্টর আর্টারো টসকানিনি বলেন, আমার জীবনে প্রথম চুমু খাওয়া এবং প্রথম সিগারেট খাওয়ার অভিজ্ঞতা দুটিই হয়েছিল একই দিনে। কিন্তু সেদিনের পর থেকে সিগারেট খাওয়ার সময় আর হয় নি।
বলা বাহুল্য, অসংখ্য নারীভক্তের আকর্ষণে টসকানিনির সেই সময়টা আর হয় নি।
চুমু খেতে গিয়ে নর-নারী প্রধানত তিনটি সমস্যায় পড়তে পারে।
প্রথমত. নাক সমস্যা। নোবেল বিজয়ী আমেরিকান লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বলেন, নাক দুটো কোথায় যায়? বিষয়টা নিয়ে আমি সব সময়ই ভেবেছি। নাক দুটো কোথায় যায়?
সুতরাং ওবামা-র মতো যাদের নাক লম্বা তাদের একটু অসুবিধা হতেই পারে।

দ্বিতীয়ত. পুরুষের দাড়ি ও গোঁফ সমস্যা। ইংরেজ সাহিত্যিক রাডিয়ার্ড কিপলিং বলেন, যদি কোনো পুরুষ তার গোঁফে মোম লাগিয়ে সেটা মসৃণ না রাখেন তাহলে তার চুমুকে নারীর মনে হতে পারে নুন ছাড়া ডিম খাওয়া।
বস্তুত চুম্বনাকাংখী নারীর কাছে পুরুষের দাড়ি ও গোঁফ অতিরিক্ত আকর্ষণ, নাকি বিকর্ষণ, তা নিয়ে যুগ যুগ ধরে বিতর্ক চলে আসছে। অনেক পুরুষ মনে করেন, গোঁফ বা মোচ রাখাটা পুরুষত্বের পরিচায়ক। তাই বয়স হয়ে গেলেও তারা পাকা গোঁফে কলপ লাগান। আবার অনেক পুরুষ মনে করেন, সুন্দরভাবে রাখা দাড়ি যেমন, ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি, নারীদের সহজে আকৃষ্ট করতে পারে। বোধহয় সে জন্য অতীতে ফ্রান্সে অনেক পুরুষ ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি রাখতেন। ফরাশি সরকার তখন ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ির ওপরে ট্যাক্স বসিয়ে ভালো আয় করেছিল।

তৃতীয়ত. দুজনার চশমা পরার সমস্যা। সেক্ষেত্রে দুজনাই চশমা খুলে সমস্যার সমাধান করতে পারেন। পুরুষের উচিত হবে নারীর কাছে অনুমতি চাওয়া। তিনি নরম স্বরে বলতে পারেন, আমি তোমাকে চুমু খেতে চাই। তোমার চশমাটা খুলে রাখি।
এটা বলে, খুব যত্নের সঙ্গে চশমাটা খুলে সাবধানে রাখতে হবে যেন আবেগী মুহূর্তগুলো কেটে গেলে সহজেই সেটা খুঁজে পান। তবে সেই নারী যদি চশমা খোলার অনুমতি না দেন তাহলে চুমু দিতে আর এগোনো উচিত হবে না।

এছাড়া দুটি শারীরিক কারণে চুমু খাওয়ায় সমস্যা হতে পারে।
এক. কারো মুখে যদি দুর্গন্ধ থাকে। ইংরেজিতে একে বলে Halitosis(হ্যালিটোসিস) বা Bad Breath (ব্যাড ব্রেথ)। সেক্ষেত্রে চুমু খাওয়ার আগেই ডাক্তারের কাছে গিয়ে নিজেকে পরীক্ষা করান এবং জানতে চান কেন আপনার মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হচ্ছে। ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা অ্যাডভাইস পাওয়ার আগেই যদি চুমু খাওয়ার বাসনা দুর্দমনীয় হয়ে ওঠে তাহলে মিন্ট লজেন্স মুখে রাখুন। ঢাকায় Fox’s mint (ফক্সেস মিন্ট) পাওয়া যায়, ২০০ গ্রাম অনূর্ধ্ব দেড় শ’ টাকায়।
দুই. দুজনের উচ্চতার মধ্যে তফাত যদি হয় খুব বেশি তাহলে কী করবেন? যিনি ছোট তিনি নিশ্চয়ই মোড়ায় উঠে অথবা চেয়ারে দাড়িয়ে চুমু খেতে চেষ্টা করবেন না। বরং যিনি লম্বা তার উচিত হবে নুয়ে পড়ে ছোটজনকে চুমু খাওয়া।

চুমু খাওয়ার বেলায় সবচেয়ে বেশি সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে যদি নারী চুমু খেতে রাজি না হন। সেক্ষেত্রে পুরুষের উচিত হবে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার চুমু-র প্রস্তাব দেয়া। এই সেকেন্ড ট্রাইয়ের পরও যদি নারী রাজি না হন তাহলে আর এ বিষয়ে জোরাজুরি করবেন না। তখন শুধু তাকে আদর করতে পারেন।
শুধু ব্যক্তিগভাবে নয়, বাণিজ্যিক এবং শৈল্পিকভাবেও চুমুর প্রকাশ ঘটতে পারে।
বাণিজ্যিকভাবে ঘটেছিল Kiss-o-gram (কিসোগ্রাম)-এর মাধ্যমে। বিদেশে কিছু কোম্পানি চুমুকে বাজারজাত করার প্রচেষ্টায় কিসোগ্রাম চালু করেছিল। ওই কোম্পানিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিলে সে তার পুরুষ ক্লায়েন্টের পক্ষ থেকে কোনো তরুণকে পাঠিয়ে দিতো প্রেমিকার ঠিকানায়। সেই তরুণ এক তোড়া গোলাপ ফুল প্রেমিকার হাতে তুলে দিয়ে প্রেমিকার গালে চুমু খেয়ে আসতো।
কিসোগ্রাম বর্জন করেছিল নারীরা। কোনো নারী ক্লায়েন্ট হয় নি। কোনো নারীর পক্ষ থেকে কোনো তরুণী যায় নি কোনো পুরুষের ঠিকানায়। ফলে কিসোগ্রাম সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়।

শৈল্পিকভাবে চুমুর বিশ্বখ্যাত প্রকাশ ঘটে ফরাশি ভাস্কর আগস্টে রদাঁ (Auguste Rodin)-র বিশ্বখ্যাত The Kiss (দি কিস)-এ। ১৮৮৯-এর এই মার্বলে খোদাই ভাস্কর্যে দুজন নরনারীকে আলিঙ্গনাবদ্ধ দেখা যায়।
দি কিস-এর অরিজিনাল টাইটেল ছিল ফ্রান্সেসকা ডা রামিনি যিনি ছিলেন একটি সম্ভ্রান্ত ইটালিয়ান পরিবারের সদস্য। দান্তে তার ইনফার্নো-তে ফ্রান্সেসকাকে অমর করেন। তার স্বামী ছিলেন জিওভানি মালাটেস্টা। দেবর পাওলা-র প্রেমে পড়েন ফ্রান্সেসকা। লান্সলট ও গুইনেভিয়ারের প্রেম কাহিনী পড়ার সময়ে পাওলা-ফ্রান্সেসকা যুগল ধরা পড়ে যান। স্বামী জিওভানি তখন দুজনকে খুন করেন।
ওই ভাস্কর্যে পাওলার হাতে ওই বইটি দেখা যায়। তবে ভাস্কর্যে প্রেমিক প্রেমিকার ঠোঁট জোড়া স্পর্শ করে নি। এতে মনে হয় ফুল স্কেল চুমু খাওয়ার আগেই তারা ধরে পড়ে মৃত্যু বরণ করেন।

সুতরাং পরকীয়া প্রেমিক-প্রেমিকারা সাবধান থাকুন।
রদাঁর এই ভাস্কর্যটি এখন ফ্রান্সে রদাঁ মিউজিয়ামে রাখা আছে।
চুমু বিষয়ে ফটোগ্রাফির সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত ছবিটি তুলেছিলেন ফরাশি ফটোগ্রাফার রবার্ট ডইসনু (Robert Doisneau)। ১৯৫০-এ প্যারিসে তোলা এই ছবিটির নাম কিস অ্যাট হোটেল ডা ভিল। এই ছবির প্রধান বৈশিষ্ট চুমুরত যুগলটি নয় – বরং তাদের চুমু খাওয়া দেখে অদূরে দাড়ানো বিস্ময়ে অভিভূত জনৈক প্রবীণ ব্যক্তি।

ইওরোপ আর আমেরিকায় চুমু নিয়ে, লেখালেখি থেকে শুরু করে গবেষণা, ভাস্কর্য থেকে শুরু করে কিসোগ্রাম, চালু হলেও আমাদের এই ভূখণ্ডে চুমুর বর্ণনা অথবা ব্যবসা কোনোটাই দেখা যায় না।
বাংলা সাহিত্যেও চুমুর অনুপস্থিতি বিস্ময়কর। বাঙালি প্রেমিক-প্রেমিকা হাত ধরাধরি, লেক-নদীর পাড়ে বা কোনো চত্বরে বসাবসি অথবা সম্ভব হলে এক গাছ থেকে আরেক গাছে ছোটাছুটির মধ্যে তাদের প্রেমের প্রকাশ সীমাবদ্ধ রেখেছে। তাই প্রেমের উপন্যাসে প্রেম উপস্থিত, কিন্তু চুমু অনুপস্থিত।

এর একটি ব্যতিক্রম শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী প্রেমের উপন্যাস পরিণীতা। সেই প্রায় ৭৫ বছর আগে প্রকাশিত পরিণীতা-তে নায়ক-নায়িকার প্রথম চুমুর সূত্রপাত হয়েছিল এভাবে :
ললিতা চোখ মুদে মনে মনে বললো, এই কলকাতার সমাজে তার মামার অবস্থাও শেখরদের কতো নিচে, সে আবার সেই মামার আশ্রিত গলগ্রহ। এদিকে সমান ঘরে শেখরের বিয়ের কথাবার্তা চলছে। দুদিন আগেই হোক, পরেই হোক, সে ঘরেই একদিন হবে। এই বিয়ে উপলক্ষে নবীন রায় কতো টাকা আদায় করবেন সেসব আলোচনাও সে শেখরের জননীর কাছে শুনেছে।
তবে কেন, তাকে হঠাৎ আজ এমন করে শেখরদা অপমান করে বসলো। এই সব কথা ললিতা সামনের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে নিজের মনে মগ্ন হয়ে আলোচনা করছিল। সহসা চমকে মুখ ফিরিয়ে দেখলো, শেখর নিঃশব্দে হাসছে। এর আগে যে উপায়ে মালাটা সে শেখরের গলায় পরিয়ে দিয়েছিল ঠিক সে উপায়ে সেই গাদা ফুলের মালাটা তার নিজের গলায় ফিরে আসছে। কান্নায় তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসতে লাগলো। তবু সে জোর করে বিকৃত স্বরে বললো, কেন এমন করলে?
তুমি করেছিলে কেন?
আমি কিছু করিনি। বলেই সে মালাটা টান মেরে ছিঁড়ে ফেলার জন্য হাত দিয়েই হঠাৎ শেখরের চোখের দিকে চেয়ে থেমে গেল। আর ছিঁড়ে ফেলতে সাহস করলো না। কিন্তু কেঁদে বললো, আমার কেউ নেই বলেই তো তুমি এমন করে আমাকে অপমান করছ!
শেখর এতোক্ষণ মৃদু মৃদু হাসছিল। ললিতার কথা শুনে অবাক হয়ে গেল! এ তো ছেলেমানুষের কথা নয়। বললো, আমি অপমান করছি, না তুমি আমাকে অপমান করছ?
ললিতা চোখ মুছে ভয়ে ভয়ে বললো, আমি কই অপমান করলাম?
শেখর ক্ষণকাল স্থির থেকে সহজভাবে বললো, এখন একটু ভেবে দেখলেই টের পাবে। আজকাল বড় বাড়াবাড়ি করছিলে ললিতা। আমি বিদেশ যাওয়ার আগে সেটাই তোমার বন্ধ করে দিলাম। বলে চুপ করলো।
ললিতা আর প্রত্যুত্তর করলো না, মাথা হেট করে দাঁড়িয়ে রইলো। পরিপূর্ণ জ্যোৎস্নাতলে দুজনে স্তব্ধ হয়ে রইলো। শুধু নিচ থেকে কালীর মেয়ের বিয়ের শাখের শব্দ ঘন ঘন শোনা যেতে লাগলো।
কিছুক্ষণ মৌন থেকে শেখর বললো, আর হিমে দাড়িয়ে থেকো না, নিচে যাও।
যাচ্ছি। বলে ললিতা এতোক্ষণ পর তার পায়ের নিচে গড় হয়ে প্রণাম করে উঠে দাড়িয়ে আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করলো, আমি কী করবো বলে দিয়ে যাও।
শেখর হাসলো। একবার একটু দ্বিধা করলো। তারপর দুই হাত বাড়িয়ে তাকে বুকের ওপরে টেনে এনে নত হয়ে তার অধরে ওষ্ঠাধর স্পর্শ করে বললো, কিছুই বলে দিতে হবে না ললিতা, আজ থেকে আপনিই বুঝতে পারবে।
ললিতার সর্বশরীর রোমাঞ্চিত হয়ে কেঁপে উঠলো।
সে সরে দাড়িয়ে বললো, আমি হঠাৎ তোমার গলায় মালা পরিয়ে দিয়ে ফেলেছি বলেই কি তুমি এ রকম করলে?
শেখর হেসে মাথা নেড়ে বললো, না। আমি অনেক দিন থেকেই ভাবছি। কিন্তু স্থির করে উঠতে পারি নি। আজ স্থির করেছি। কেননা আজই ঠিক বুঝতে পেরেছি, তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারবো না।
ললিতা বললো, কিন্তু তোমার বাবা শুনলে ভয়ানক রাগ করবেন, মা শুনলে দুঃখ করবেন। এ হবে না শে . .
বাবা শুনলে রাগ করবেন সত্যি। কিন্তু মা খুব খুশি হবেন। সে যাই হোক। যা হওয়ার হয়ে গেছে, এখন তুমিও ফেরাতে পারো না, আমিও পারি না। যাও, নিচে গিয়ে মাকে প্রণাম করো গিয়ে।

লক্ষণীয় যে, ললিতা কতো সিরিয়াসলি নিয়েছিল শেখরের চুমুকে।
বাংলাদেশে একজন নারীকে আমি জানি, প্রথম চুমুর পর সারা রাত যিনি নামাজ পড়েন এবং চুমুদাতা পুরুষটিকে পতি রূপে বরণ করেন।
সুতরাং, অবিবাহিত বাঙালি নর ও নারীদের চুমু খাওয়ার বিষয়টিকে অবশ্যই সিরিয়াসলি নেয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, দায়িত্বশীল ভালোবাসার সঙ্গে চুমুর সম্পর্ক ওতপ্রোত।

এসএমএসের যুগে ভালোবাসা ও চুমুকে নিয়ে অনেক শর্ট ছড়া বেরিয়েছে। যেমন :
Love is the name
Kiss is the game
Forget the name
Let’s play the game

Love is heat
You are sweet
When two lips meet
Love is complete

Love is blind
Be very kind
When I kiss you
Please don’t mind

কিন্তু এসবই তো ইংরেজিতে। তাই আমি বাংলায় একটা এসএমএস ছড়া প্রেমিক-প্রেমিকাদের গিফট দিলাম এবারের ভ্যালেনটাইনস ডে-তে :
গোলাপের রঙ লাল
চকোলেট মিষ্টি
ফেব্রুয়ারিতে মনে রেখ
চুমু খাবার দিনটি।

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১১
শফিক রেহমান : লেখক, সম্পাদক, টিভি অনুষ্ঠান উপস্থাপক।